আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, নিজের অনুপস্থিতিতে দলের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সভাপতিমণ্ডলীর সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
ভারতের অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-এর নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারকে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এ কথা জানান। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ সরকার পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর কোনো ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এটিই তাঁর প্রথম দীর্ঘ সাক্ষাৎকার বলে জানা গেছে।
দলীয় নেতৃত্বের প্রশ্নে যা বললেন হাসিনা
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেন, দলের বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে শেখ সেলিম এখন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ, তাই তাঁর অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন। একই সঙ্গে তিনি ছোট বোন শেখ রেহানার সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন, জানিয়ে দেন যে রেহানা সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।
শেখ হাসিনা আরও জানান, তিনি নিয়মিতভাবে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তাঁদের বর্তমান পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অনেককে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
দেশে ফেরার পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা শঙ্কা
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কারণ মাসটিকে তিনি বিজয়ের মাস হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, দেশে ফেরার পথে বিমানবন্দর এলাকাতেই তাঁকে ও তাঁর সফরসঙ্গীদের প্রাণনাশের ঝুঁকি থাকতে পারে বলে আশঙ্কা জানান।
৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও তিনি কথা বলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি দেশ ছাড়তে চাননি এবং হেলিকপ্টারে ওঠার সময় পর্যন্ত জানতেন না যে তাঁকে ভারতে নেওয়া হচ্ছে; বরং তিনি ভেবেছিলেন তিনি টুঙ্গিপাড়ায় নিজের গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশে উগ্রপন্থী শক্তির উত্থান নিয়ে ভারতকে সতর্ক করেন, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক রহমানের কড়া সমালোচনা করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমকে “সুপরিকল্পিত নকশা” বলে আখ্যা দেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
একাংশ শেখ সেলিমকে সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, দলের প্রবীণতম প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং কঠিন সময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এই সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত। আরেক অংশ এই ঘোষণায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন, শেখ সেলিম নিজে বর্তমানে একাধিক মামলা ও তাঁর পরিবারের সম্পদ অবরুদ্ধ থাকাসহ নানা আইনি জটিলতার মুখে থাকা অবস্থায় তিনি কতটা কার্যকরভাবে দলের হাল ধরতে পারবেন। কিছু সমর্থক আশা প্রকাশ করেছেন যে এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দলের মধ্যে বিভ্রান্তি কমবে এবং তৃণমূল নেতাকর্মীরা স্পষ্ট নেতৃত্ব-কাঠামো পাবেন, আবার কারও কারও মতে তরুণ ও নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে না আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সব মিলিয়ে, ঘোষণাটিকে ঘিরে দলীয় সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি ও সংশয়—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা আলোচনায়।
