বিপাশা চক্রবর্তী
আমরা এত দিন প্রক্সি নেটওয়ার্ক বলতে বুঝতাম ক্ষমতাশীলদের কোনো বিশ্বস্ত পিএ, আত্মীয়, চালক, দূর সম্পর্কের বিশ্বস্ত স্বজন বন্ধু বা কোনো ব্যবসায়িক পার্টনারের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা আড়াল করা। কিন্তু বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও অপরাধবিজ্ঞানের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রক্সি নেটওয়ার্কের কাজের ধরন এখন আর কেবল সাধারণ মানুষ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নির্ভর নেই।
বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার ও প্রক্সি মেকানিজম কতটা বিপজ্জনক ও উচ্চপ্রযুক্তিভিত্তিক রূপ নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে নিতে পারে সে সম্পর্কেই আজকে আলোচনা করবো৷
উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও তদন্তের আলোকে তার কিছু ফোরেন্সিক চিত্র পাঠকদের জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
প্রথমেই আসি কৃত্রিম পরিচয় বা এআই প্রক্সি অর্থাৎ AI & Synthetic Identity প্রসঙ্গে।
এখন রক্তমাংসের মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া পরিচয় বা ফেক বায়োমেট্রিক ব্যবহার করা হচ্ছে। আসল মানুষের কোনো অস্তিত্ব ছাড়াই ভুয়া এনআইডি ও ফেসিয়াল স্ক্যান বানিয়ে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে KYC পাস করানো হচ্ছে। এমনকি সাধারণ মানুষের অজান্তেই অনলাইন থেকে তাদের পরিচয় ভাড়া নিয়ে তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল মানি মিউল। যার মাধ্যমে খুব ছোট ছোট অঙ্কে কোটি কোটি টাকা আন্তর্জাতিক সীমানা পার হয়ে যাচ্ছে।
ক্রিপ্টো-মিক্সার ও নোকেওয়াইসি অফশোর হাব এর ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রথাগত ব্যাংকিংয়ে নজরদারি বাড়ায় অপরাধীরা এখন ঝুঁকছে DeFi অর্থাৎ Decentralized Finance ও ক্রিপ্টোকারেন্সির যেমন USDT বা Bitcoin দিকে। আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার রোধকারী সংস্থা FATFএর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রক্সিরা এখন এমন সব ডিজিটাল প্রটোকল ব্যবহার করছে যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেই। সেকেন্ডের মধ্যে ডিজিটাল মুদ্রা হাতবদল করে মূল টাকার উৎস পুরোপুরি উধাও করে দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়াও ভুয়া বিদেশি ডিরেক্টর ও শ্যাডো অফিস Professional Nominees তৈরি করা হয়।
সেশেলস, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস বা দুবাইয়ের মতো অফশোর হাবগুলোতে প্রক্সিদের উপস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল। টাকা দিয়ে আন্তর্জাতিক ল ফার্ম বা এজেন্টদের মাধ্যমে ভাড়াটে ডিরেক্টর Nominee Director বসিয়ে নামসর্বস্ব কোম্পানি খোলা হয়। ফলে কাগজে কলমে বাংলাদেশি কোনো গডফাদার বা তার দেশীয় প্রক্সির নামই থাকে না। আন্তর্জাতিক অডিটররা কেবল বিদেশি সেই ভাড়াটে এজেন্টের নামই দেখতে পান।
অদৃশ্য সেবা বা সার্ভিস-বেজড মানি লন্ডারিং এর প্রবনতা বাড়ছে।
কাগজেকলমে ভুয়া জুতো বা চামড়া রপ্তানি দেখানোর দিন শেষ হয়ে আসছে। এখন শুরু হয়েছে অদৃশ্য সেবার আড়ালে টাকা পাচার।
ভুয়া আইটি ও কনসালটেন্সি দেখানো হয়। বিদেশে সফটওয়্যার উন্নয়ন বা কনসালটেন্সি দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে কোনো কাজ না হলেও সার্ভিস ফির নামে ব্যাংকের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার পাচার হয়ে যাচ্ছে।
এবার আসি ডিজিটাল আর্ট ও এনএফটি প্রসঙ্গে।
ইন্টারনেট জগতের সামান্য একটি ডিজিটাল ছবি কোটি টাকায় ভুয়া প্রক্সি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কেনাবেচা দেখিয়ে কালো টাকা মুহূর্তেই সাদা করা হচ্ছে।
NFT এর পূর্ণরূপ হলো Non-Fungible Token নন-ফাঞ্জিবল টোকেন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এনএফটি হলো ইন্টারনেটের ডিজিটাল জগতে কোনো সম্পদের একচ্ছত্র মালিকানার ডিজিটাল সনদ।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য দুটি বিষয় জানা প্রয়োজন।
তা হলো ফাঞ্জিবল Fungible এবং নন-ফাঞ্জিবল Non-Fungible এর পার্থক্য।
ফাঞ্জিবল হলো পরিবর্তনযোগ্য। টাকার নোট বা ক্রিপ্টোকারেন্সি যেমন: বিটকয়েন। আপনার কাছে থাকা ১০০ টাকার একটা নোট যদি অন্য কারো ১০০ টাকার নোটের সাথে বদলে নেন তাহলে তার মান একই থাকে। কারণ সব ১০০ টাকার নোটের মূল্য সমান।
নন-ফাঞ্জিবল অনন্য বা অদ্বিতীয়। এমন একটি জিনিস যা বিশ্বের অন্য কোনো কিছুর সাথেই হুবহু অদলবদল করা যায় না। যেমন ধরুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে লেখা কোনো মূল কবিতা কিংবা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মূল ‘মোনা লিসা’ ছবি। অথবা আপনার নিজের জমির দলিলও হতে পারে। এগুলো অনন্য। তাই এগুলোর মান বা সত্তা অন্য কিছুর সাথে মেলানো যায় না।
তাহলে, এনএফটি কীভাবে কাজ করে?
ডিজিটাল জগতে যেকোনো ছবি, ভিডিও, গান, বা থ্রিডি আর্ট শত শত বার কপি বা ডাউনলোড করা যায়। কিন্তু এই ডিজিটাল সম্পদটির মূল বা আসল মালিক কে? এই প্রশ্নের সমাধান দেয় এনএফটি।
এনএফটি তৈরি করা হয় ব্লকচেইন Blockchain নামক এক সুরক্ষিত ডিজিটাল খাতায় যেমন: Ethereum ব্লকচেইন।
এতে মালিকানার প্রমাণ হয়। একজন শিল্পী তাঁর তৈরি কোনো ডিজিটাল আর্টকে এনএফটিতে রূপান্তর করেন। একে Minting বলা হয়। তখন ব্লকচেইনে স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে যায় যে এই ডিজিটাল সম্পদটির আসল সৃষ্টিকর্তা এবং বর্তমান মালিক কে।
এটি ডিজিটাল ফাইলে এক অদৃশ্য ও পরিবর্তনঅযোগ্য ডিজিটাল স্বাক্ষর যোগ করে। ফলে অন্য কেউ নকল করতে পারে না।
এনএফটি কী কাজে ব্যবহৃত হয়?
ছবি বা চিত্রকর্মে ডিজিটাল শিল্পীরা তাঁদের আঁকা আর্ট সরাসরি সংগ্রাহকদের কাছে এনএফটি হিসেবে বিক্রি করতে পারেন।
গেমিংও আছে এখানে। ভিডিও গেমের বিভিন্ন বিশেষ চরিত্র, পোশাক বা অস্ত্র এনএফটি হিসেবে কেনাবেচা হয়।
পাশাপাশি আছে সংগীত ও ভিডিও। গান বা বিশেষ কোনো কনসার্টের টিকিট এনএফটি আকারে প্রকাশ করা হয়। ভার্চুয়াল প্রপার্টিতেও ব্যবহার হয়। মেটাভার্স বা ভার্চুয়াল জগতে জমি কেনাবেচায় এনএফটি ব্যবহৃত হয়।
তো এনএফটি নিয়ে বিতর্ক ও সতর্কতা কি?
মানিলন্ডারিং বা ডিজিটাল জালিয়াতির আলোচনার প্রসঙ্গে এনএফটির কথা প্রায়ই উঠে আসে। কারণএটি কৃত্রিমভাবে তৈরি উচ্চমূল্যের আড়ালে টাকা ধোলাই বা কালো টাকা সাদা করার Layering ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে অনেক সময় অপব্যবহৃত হয়।
এতে আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং এড়ানো সহজ। ফলে অপরাধীরা এর অন্যায্য সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।
এনএফটি হলো ইন্টারনেটের জগতে কোনো অদ্বিতীয় ডিজিটাল জিনিসের আসল মালিকানার ডিজিটাল প্রমাণপত্র।
বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট ট্রাস্ট এর ব্যবহার হচ্ছে।
এখন আর সরাসরি প্রক্সির নামে বিদেশে বাড়ি কেনা হয় না। কারণ সেখানে আয়ের উৎস জানাতে হয়। তাই প্রক্সিরা গঠন করে ফ্যামিলি ট্রাস্ট বা শেল প্রপার্টি ফান্ড। সেই ফান্ডের আড়ালে বেনামি টাকা ঢোকানো হয়। যা দিয়ে পরবর্তীতে লন্ডন কানাডার বেগমপাড়া বা নিউ ইয়র্কে বিলাসবহুল প্রপার্টি কেনা হয়।
আমাদের নাগরিক ভাবনায় কী পরিবর্তন দরকার?
আমরা যদি এখনো মনে করি প্রক্সি মানে কোনো নেতার পিএ, আত্মীয় বা বিশ্বস্ত লোক তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধের গতিপথ বুঝতে ভুল করব।
আজকের দিনে প্রক্সি হতে পারে ডার্কওয়েবের কোনো ক্রিপ্টো ওয়ালেট, একটা বিদেশি ভুয়া আইটি ফার্ম, কিংবা এআই দিয়ে তৈরি কাল্পনিক কোনো পরিচয়!
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট BFIU, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে অবশ্যই বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের আরো উন্নত ও দক্ষ করতে হবে। এআই ফোরেন্সিক অডিটিং ও আন্তর্জাতিক ডেটাশেয়ারিংয়ের দিকে এগোতে হবে। এবং অবশ্যই দলমত বিবেচনা না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। যদিও সেটা সম্ভব হয়না🙄
নাগরিক হিসেবে আমাদেরও প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন অপরাধের মেকানিজম সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
