উকিল মুন্সীকে শুধু বাউল বললে তাঁর পরিচয়ের একটা অংশ বলা হয়, পুরোটা নয়। তিনি ছিলেন হাওরাঞ্চলের বিচ্ছেদী গানের এক অসামান্য সাধক। তাঁর গানে প্রেম আছে, ধর্ম আছে, আত্মার সঙ্গে পরমের বিচ্ছেদ আছে। কিন্তু সবকিছুর ওপর আছে অপেক্ষা। কাউকে পাওয়ার অপেক্ষা নয়, কাউকে হারানোর পরের অপেক্ষা।
১৮৮৫ সালে নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ির নূরপুর বোয়ালীতে জন্মেছিলেন সৈয়দ আবদুল হক আকন্দ। কৈশোরে ঘেটুগান, তারপর গজল, তারপর বাউল সাধনা। একদিকে মসজিদে ইমামতি, অন্যদিকে গানের আসর। তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন হবিগঞ্জের রিচি দরবার শরিফের পীর সৈয়দ মোজাফ্ফর আহমদ, গানের গুরু বাউল রশিদ উদ্দিন। পীরের নির্দেশে তিনি গানে একতারা ছাড়া অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ছুঁতেন না, এমন উল্লেখও পাওয়া যায়।
রশিদ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু গুরুশিষ্যের ছিল না। তাঁরা ছিলেন একই সময়ের হাওরাঞ্চলের একটি বড় গানের পরিসরের অংশ। রশিদ, জালাল উদ্দিন খাঁসহ আরও অনেকে গ্রাম থেকে গ্রামে, আসর থেকে আসরে গান করে বেড়াতেন। এ গান শহরের মঞ্চের গান ছিল না। এর বিষয় ছিল বর্ষায় ডুবে যাওয়া জনপদ, নৌকা, নদী, উঠান, নাইওর, বিচ্ছেদ, আর দীর্ঘ অপেক্ষা।
উকিল মুন্সীর গান শুনলে এই ভূগোলটাই ধরা পড়ে। “অপরাধী হইলেও আমি তোর, তুই আমারে ছাড়িস না”— এক গানে এই আকুতি। আবার আরেক গানে গৃহবধূর কণ্ঠে আসে নাইওরে যাওয়ার তৃষ্ণা: “আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে, পুবালি বাতাসে…” আর তার শেষে সেই আশ্চর্য পঙ্ক্তি: “উকিল মুন্সীর হইবে নাইওর, কার্তিক মাসের শেষে রে।”
কার্তিকের শেষে নাইওর। হাওরজীবনে নাইওরের সময় তো বর্ষা, উকিল মুন্সীর নাইওর তবু কার্তিকের শেষে। এই পঙ্ক্তির সঙ্গে তাঁর পীরের মৃত্যুর সময়ের একটা সম্পর্ক প্রচলিত ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়। সে ব্যাখ্যা মানলে গানটি একই সঙ্গে গৃহবধূর নাইওরের গান আর এক মরমি সাধকের গুরু-বিরহের গান হয়ে ওঠে।
এই বিরহই উকিল মুন্সীর গানের স্বাক্ষর। “আমার গায়ে যত দুঃখ সয়”, “ওরে দখিন হাওয়া রে”, “সোনা বন্ধুয়া রে, এতো দুঃখ দিলে তুই আমারে”— এসব গানে ব্যক্তিগত প্রেম আর আধ্যাত্মিক আকুতির সীমারেখা বারবার মুছে যায়। শুধু প্রেমের গান বা শুধু ধর্মীয় গান বলে তাঁর গানকে বোঝা যায় না।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত সমীকরণও এখানেই। যিনি বাউল আসরে গান করতেন, তিনিই মসজিদে ইমামতি করতেন। কখনো গানের আসর থামিয়ে জানাজার নামাজ পড়িয়েছেন। তাঁর কাছে ধর্ম আর গান আলাদা জগৎ ছিল না।
১৯৭৮ সালে উকিল মুন্সী মারা যান। তাঁর গান থেকে যায় হাওরের মানুষের মুখে মুখে। বহু দশক পরে হুমায়ূন আহমেদের শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিতে বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে “আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে” নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। হাওরের এক শতাব্দী-পুরোনো বিচ্ছেদের গান তখন শহুরে বাংলাদেশেরও গান হয়ে যায়।
উকিল মুন্সীর গানকে কোনো একটি ঘরানার খোপে আটকানোর চেয়ে তাঁর ভূগোলের মধ্যে রাখাই বোধহয় বেশি সংগত। জলমগ্ন হাওর, দূরের নাইওর, বর্ষার দীর্ঘ অপেক্ষা, আর কারও না-ফেরার বেদনা। সেই বেদনারই আরেক নাম উকিল মুন্সী।
