দিলু নাসের
ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা ইতালির পুলিশ তদন্ত করবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচার হওয়া উচিত।
এই ঘটনার পর দেশে- বিদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন । কেউ কেউ আবার যে ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, সেটিও গভীর উদ্বেগের। অভিযুক্তদের বাড়িঘর চিহ্নিত করে জ্বালিয়ে দেওয়া কিংবা তাঁদের আত্মীয়স্বজনকে হেনস্তা করার আহ্বান কোনোভাবেই প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। একজনের অপরাধের দায় তার মা-বাবা, সন্তান, ভাই-বোন বা আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপানো যায় না।
তবে ভেনিসের এই ঘটনা আমাদেরকে গত দুই বছরের বাংলাদেশের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশে মব সহিংসতায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৪ সালে অন্তত ১২৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৯৭ জন মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। অন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব আরও বেশি। সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও বাস্তবতাটি ভয়াবহ। দেশে এখন আইনের বাইরে জনতার হাতে বিচার একটি বড়ো সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
একজন পরিচিত অভিনেত্রীর ওপর হামলার ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় হাজার মানুষ প্রতিবাদ করছেন, এটি অবশ্যই ভালো। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে দেশের শহরে বন্দরে অচেনা কোনও মানুষকে যখন রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, যখন কাউকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে, যখন কোনও নারীকে জনতার সামনে হেনস্তা করা হয়েছে, তখন আমাদের কণ্ঠ এত জোরালো ছিল কি?
গত দুই বছরে আমরা আরও দেখেছি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কীভাবে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন, থানায় হামলা হয়েছে, ধানমন্ডি ৩২-এ হামলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, ম্যুরাল এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর হয়েছে।
এগুলো কোনও একটি দলের ক্ষতি নয়, এগুলো রাষ্ট্রের আইন, ইতিহাস ও সামাজিক সহাবস্থানের ওপর আঘাত।
এইসব সহিংসতার শিকার শুধু কথিত অপরাধী বা রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। বিভিন্ন ঘটনায় সাধারণ মানুষ, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও সংখ্যালঘুরাও অপমান ও হামলার শিকার হয়েছেন। ১৫ আগস্টে ধানমন্ডি ৩২-এর ঘটনাগুলো তার একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ। সেখানে ফুল দিতে বা শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষদেরও বাধা দেওয়া, অপমান ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে একজন নারীকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানেও বয়স্ক মানুষ ও নারীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থানের কারণে অপমানিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমরা কতোজন এর প্রতিবাদ করেছি? এখানে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার, ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলার ভিডিও দেখে আমরা যে ক্ষোভ প্রকাশ করছি, দেশের রাস্তায় একইভাবে কোনও নারী বা বৃদ্ধ মানুষকে লাঞ্ছিত করা হলে তখন কি আমরা একইভাবে প্রতিবাদ করেছি? অথবা করবো?
একজন পরিচিত অভিনেত্রীর ওপর হামলার প্রতিবাদ অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু অচেনা একজন নারী যখন জনতার সামনে অপমানিত হন, তখন তাঁর মর্যাদার মূল্য কি কম?একজন বৃদ্ধ যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হেনস্তার শিকার হন, তখন তাঁর মানবিক মর্যাদা কি কম? একজন সাধারণ মানুষ যখন মবের হাতে প্রাণ হারান, তখন তার জীবনের মূল্য কি কম?
গত দুই বছরে আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মব সন্ত্রাস এবং প্রতিশোধের যে সংস্কৃতি দেখেছি, তা সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন, থানায় হামলা হয়েছে, ধানমন্ডি ৩২ আক্রান্ত হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও ম্যুরাল এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ যখন ব্যক্তি, পরিবার ও ইতিহাসের ওপর প্রতিশোধে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্রেরই হয়। তাই বাঁধনের এই ঘটনা আজ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হওয়া উচিত।ইতালিতে যারা অপরাধ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের তদন্ত করবে ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; আদালত প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেবে। বাংলাদেশে বসে তাদের আত্মীয়স্বজনকে হেনস্তা করার কোনও অধিকার কারও নেই। গত দুই বছরের সহিংসতার সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা যদি আমরা গ্রহণ করতে চাই, তাহলে ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদকে সেই শিক্ষারই অংশ করতে হবে। কারণ একজন বাঁধনের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে যদি আমরা আরেকজন অচেনা নারীকে অপমান করি, একজন বৃদ্ধের বাড়িতে হামলা করি কিংবা কোনও নিরপরাধ পরিবারকে আগুনে পুড়িয়ে দিই, তাহলে আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছি না, বরং মনে হবে আমরা শুধু অন্যায়ের পক্ষ বদলাচ্ছি। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো-সে নিজের পক্ষের মানুষের অধিকার যেমন রক্ষা করে, তেমনই প্রতিপক্ষের নিরপরাধ মানুষের অধিকারও রক্ষা করে। তাই ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিবাদ হোক। একই সঙ্গে বাংলাদেশে গত দুই বছরের মব সন্ত্রাস, নারী ও বয়স্কদের লাঞ্ছনা এবং প্রতিশোধের রাজনীতির বিরুদ্ধেও আমাদের কণ্ঠ সমান জোরালো হোক। এটাই আজকের প্রত্যাশা।
লেখক, কবি । লন্ডন। ৯ সেপ্টেম্বর ২০ ২৬
