কবির য়াহমদ
আজ শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে বিশাল মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। মিছিলটি এত বড় ছিল যে এটাকে পণ্ড করতে পুলিশকে রাবার বুলেট ছুঁড়তে হয়েছে, লাঠিচার্জ করতে হয়েছে। আটক হয়েছেন একাধিক মিছিলকারী। মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। বলছে পাঁচটি ককটেল উদ্ধারের কথাও।
তবু বলছি, আওয়ামী লীগের মিছিল বিশাল হলে সরকার ও দল হিসেবে বিএনপির উদ্বেগের কিছু নেই। কারণ দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ থাকলেও বিএনপি নিশ্চিহ্ন হবে না। দলের কোটি কোটি সমর্থক ও ভোটার থেকে যাবে। তারাই বাঁচিয়ে রাখবে দলটিকে।
কিন্তু আওয়ামী লীগ ফিরলেই জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি শেষ। তবে এনসিপি যেভাবে শেষ হবে ঠিক সেভাবে শেষ হবে না জামায়াতে ইসলামী। কারণ তাদের রয়েছে শক্ত একটা সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাদের কিছু কর্মী আছে, মোটামুটি সংখ্যার একটা ভোটারশ্রেণিও আছে। কিন্তু ওসবের কিছুই নেই এনসিপির। তারা কিংস পার্টি। ইউনূস থেকে জন্ম নেওয়া, জামায়াত ও বিএনপি দ্বারা প্রতিপালিত তারা। আওয়ামী লীগ ফিরলে জামায়াত ও বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদের দিকে আর বিনিয়োগ করবে না।
জামায়াত শেষ বলছি এই সূত্রে, কারণ জাতীয় সংসদে এবার তারা যত সংখ্যক লোক গেছেন, সেটা ভবিষ্যতে আর কখনই হবে না। জামায়াতের আমিরের রাজনৈতিক ইতিহাস ছিল যেখানে জামানত হারানোর শঙ্কা আর বাস্তবতার, সেখানে এখন তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, এবং মিন্টু রোডের বাসিন্দা। তার সংসদ-গমনও নানা কারণে আলোচিত। ঠিক এভাবে প্রায় সবাই। এসব করতে হয়েছে মূলত আওয়ামী লীগবিহীন সংসদ সম্ভব– এটা প্রমাণে।
গুলশানের আওয়ামী লীগের মিছিল অনেকের চোখ ছানাবড়া করে দিয়েছে। আমিও বিস্মিত হয়েছি। টানা দুই বছর ইতিহাসের সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় থেকেও দলটি এত লোক জড়ো করতে পারল কীভাবে? ফলে ধারণা করা যায়, মাঠে উল্লেখের মতো নেতা না থাকলেও, দূরে থেকেও তারা সাংগঠনিক ভারসাম্য ও জনসমাগমে সক্ষম।
এখনও আওয়ামী লীগ জান-বাজি রেখে মাঠের রাজনীতিতে নামেনি। তবু এই মিছিলের জনসমাগম বিস্ময় জাগানিয়া।
এ মিছিলের পর আওয়ামী লীগবিরোধী মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এরিমধ্যে অনেককে বলতে দেখছি– প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকায় এত বড় মিছিল কীভাবে সম্ভব? এজন্য অনেককে বলতে দেখছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি দায়ী এসবে। আচ্ছা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একা কী করবে? উনি আওয়ামী লীগ ঠেকাতে সর্বস্ব নিয়োগ করেছেন ইতিমধ্যেই। এর বেশি করতে গেলে ঢাকায় দশ লাখ পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর জনবল দরকার? প্রতি ঘরে ঘরে যেখানে আওয়ামী লীগের লোকজনের বাস, সেখানে কীভাবে সম্ভব মানুষ ঠেকানো?
বলছি, নির্বাহী আদেশ দিয়ে আওয়ামী লীগকে ঠেকিয়ে দেওয়ার ফল হিতে বিপরীত হতে যাচ্ছে। এতে করে দলটির সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরাও দলের প্রতি চূড়ান্ত নিবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাঠে নামতে বাধা, তাই তারা মাঠে নামতে আরও বেশি উৎসাহী হচ্ছে।
নিষিদ্ধ শব্দ দিয়ে বস্তুত আওয়ামী লীগকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিছু করলে অপরাধ, কিছু না করলেও অপরাধ– এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি তাদের প্রতি। ফলে চুপ থেকেও যখন অনিরাপদ, চুপ থেকেও যখন অপরাধী; তখন কিছু একটা করে ফেলার বাসনা তাদের মধ্যে তীব্র হচ্ছে। এটা কিন্তু ভয়ঙ্কর। এখন না হয় উপলক্ষ নেই, কিন্তু যখনই কোনো উপলক্ষ আসবে, তখন দেখবেন এরা বেপরোয়া হয়ে যাবে, কেউ তাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
এখানে তাই সরকারের নীতিনির্ধারকদের কট্টরপন্থী অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে হলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগের পথ রচনা করতে হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে সরকারকে পাঁচ বছর সময় দেওয়ার কথা আলোচনা হতে পারে। সরকার থেকে এমন প্রস্তাব পেলে আওয়ামী লীগ এখানে আপত্তি করবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ গত দুই বছরে তারা নানা ভাবে পর্যুদস্ত। এই পরিবেশ নিশ্চিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে জামায়াত-এনসিপি ও ইসলামী দলগুলো। কারণ তারা জানে ইতিহাসের সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে তারাই। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা মানে তাদের চলে যাওয়া। রাজনীতির মাঠ থেকে গণমাধ্যম– কোথাও স্পেস পাবে না তারা। ফলে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ দেবে তারা।
জুলাই-মামলা, ট্রাইব্যুনালের রায়, শাস্তি, শাস্তি কার্যকর– ওই আলাপটা একদিকে রাখুন। চলমান বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সম্যক অবগত দেশবাসী। এসব আইনের নামে হলেও আইনের মাধ্যমেই ওসবে বিরতি দেওয়ার সুযোগ আছে। জুলাই থেকে শুরু করে তৎপরবর্তী সকল হতাহতের বিচার করুন সঠিক প্রক্রিয়ায়। এতে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবার অন্তত সুবিচার পাবে। নিজেদের চাওয়ামতো এই বিচারকে দেখিয়ে, আইন-আদালত দেখিয়ে একটা অস্থিতিশীল বাংলাদেশ যদি রেখে দেন, তবে সরকারি দল হিসেবে বিএনপিরই ক্ষতি বেশি।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচিভিত্তিক কোনো রাজনীতি এখন পর্যন্ত নেই। মাঝেমধ্যে যেসব মিছিল হচ্ছে, ওগুলো স্থানীয়দের উদ্যোগে; কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে নয়। তবু দেশে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। তবু দেশ ভালো নেই। সরকার চলতে পারছে না, সরকার চালানো যাচ্ছে না। এই চালাতে না পারার ঘটনায় কিছু না করেই আওয়ামী লীগ লাভবান হচ্ছে।
প্রায় সাত মাসের সরকার হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক আস্থার অভাব এবং বহুপাক্ষিক সম্পর্কের স্থবিরতা দৃশ্যমান। এই সময়ের মধ্যে কয়জন বিদেশি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান বাংলাদেশ সফর করেছেন? কয়টা দ্বিপাক্ষিক সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী? সংখ্যা গুনে দেখেন; পাবেন ভয়াবহ তথ্য। বিদেশিরা আসছে না, বিদেশিদের থেকে আমন্ত্রণ আসছে না– এসব কিন্তু ইতিবাচক বার্তা নয়।
গ্যাস-বিদ্যুৎ-সারসহ বিবিধ সংকট দেশে। তবু লোকসানি প্রতিষ্ঠান বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কিনতে বাধ্য হতে হচ্ছে সরকার। আমেরিকা থেকে কিনেছ, তাই আমাদেরও কিনতে হবে– এমন বার্তা দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এমনটা সম্ভব হচ্ছে মূলত বিদেশিরা আমাদের সরকারের দুর্বলতা ধরে ফেলেছে। সমর্থনের বিনিময়ে তারা বাণিজ্য করতে যাচ্ছে বেপরোয়াভাবে। এই রাজনৈতিক পরিবেশ রেখে দিলে, এটা কিন্তু চলতেই থাকবে!
