চাল, জ্বালানি তেল, পেঁয়াজ-মরিচের মতো নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে শিল্পখাতের কাঁচামাল- সবই আসছে ভারত থেকে। এই ধারাবাহিকতায় এবার এলো ইলিশ মাছও!
যে ইলিশ নিয়ে বাহাদুরি ছিল বাংলাদেশের, এখন সাধারণের পাতে জুটছে না সেই মাছ। ২০২৪-এর জুলা্ই-আগস্টের সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের ভাষ্য ছিল, শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে সব ইলিশ পাঠিয়ে দেয় বরে বাংলাদেশিরা ইলিশ খেতে পারে না, দামও কমে না। ভারতের আগ্রাসনে বাংলাদেশের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে… ইত্যাদি। তবে ৫ই আগস্টের পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি দেখা গেছে উল্টো! ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে বহুগুণে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বেড়েছে অতীতের চেয়েও বেশি পরিমাণে। বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতিও।
৫ই আগস্টের পর ইলিশ-রাজনীতির ‘পেশিশক্তি’ দেখিয়েছিল বাংলাদেশ বহুবার। ‘আগে বাংলাদেশিরা ইলিশ খাবে, তারপর ভারতে রপ্তানি করা হবে’ এমন হুংকার ছেড়েছিল সরকারের দায়িত্বশীলরা। কিন্তু প্রকৃত চিত্র ভিন্ন- দেশে ইলিশের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে ইলিশ।এই পরিস্থিতিতে উল্টো ভারত থেকে ইলিশ আমদানি শুরু হয়েছে।
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে গত দুই মাসে বিপুল পরিমাণ ইলিশ মাছ দেশে ঢুকেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে এই বন্দর দিয়ে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি করা হয়েছে। বেনাপোল ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন অফিসার সজীব সাহা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয় সূত্র জানায়, জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে মোট ২২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বেনাপোল দিয়ে ইলিশ আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বেনাপোলের মেসার্স সততা ফিস, মেসার্স রাব্বি এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সততা ফিস ফিড, মেসার্স ফেমাস ট্রেডার্স ও মেসার্স রিয়ান্স হাব; যশোরের মেসার্স এইচ এম আর ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স এন. কে ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স সুরাইয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও মেসার্স আরকিন ইন্টারন্যাশনাল; বাগআঁচড়ার মেসার্স জনতা ফিস; ঢাকার মেসার্স স্বর্ণালী এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স রুপা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স মারিয়াম এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স সাজ্জাদ এন্টারপ্রাইজ; যাত্রাবাড়ির একটি প্রতিষ্ঠান; খুলনার মেসার্স বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনাল; সাতক্ষীরার মেসার্স জান্নাত এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স আশিক এন্টারপ্রাইজ এবং পাবনার মেসার্স নোমান এন্টারপ্রাইজসহ মোট ২২টি প্রতিষ্ঠান।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। জুলাইয়ে তিনটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ। পরের মাস আগস্টে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি করা হয় আরও ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি।
দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ৫১০ টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ের ইলিশের মূল্য ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে আমদানি করা ইলিশের মূল্য ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
বেনাপোল দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ দেশে আসায় বেনাপোল, শার্শা, বাগআঁচড়া, নাভারণ, যশোর বড় বাজারসহ জেলার বিভিন্ন মাছের বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে এসব মাছ ‘মিয়ানমারের ইলিশ’ নামে পরিচিত। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, অনেক সময় দেশি ইলিশ ভেবে তারা এসব মাছ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।
তাদের দাবি, স্বাদ ও গন্ধে দেশি ইলিশের সঙ্গে এসব মাছের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকলেও ক্রেতাদের অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি জানানো হচ্ছে না।
যশোরের কয়েকজন আড়তদারের দাবি, মিয়ানমার থেকে আসা এসব ইলিশ ভারত হয়ে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। তবে বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেনাপোল দিয়ে আমদানি করা ইলিশ ভারতীয়।
তাদের ভাষ্য, মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে বাজারে মিয়ানমারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে বলেও তারা নিশ্চিত করেছেন।
এরই মধ্যে একটি সূত্র দাবি করেছে, বেনাপোল দিয়ে কিছু ইলিশ অবৈধভাবেও দেশে ঢুকেছে। গত ২২শে জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা ১২ কার্টন ভারতীয় ইলিশ জব্দ করে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এসব মাছের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬০ কেজি।
যশোর বড় বাজারে ইলিশ কিনতে আসা লোন অফিসপাড়ার বাসিন্দা ইকবাল করিম জানান, দেশি ইলিশ মনে করে তিনি একটি মাছ কিনেছিলেন। কিন্তু রান্না করে খাওয়ার পর তার মনে হয়েছে মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। তার মতে, দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য দেশি ও বিদেশি ইলিশ আলাদা করে চেনা বেশ কঠিন।
বাজারের ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কেজি ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ প্রতি কেজি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ১ কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের কথিত মিয়ানমারের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি। অর্থাৎ ওজনে তুলনামূলক বড় হলেও বিদেশি ইলিশের দাম দেশি ইলিশের চেয়ে অনেক কম। দামের এই বড় ব্যবধানের কারণে যশোরের বাজারে কম দামের মাছের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।
সরেজমিনে যশোর বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মা ফিস, গৌরব ফিস, মেসার্স তিতাস ফিস ও মেসার্স জামান ফিসসহ কয়েকটি আড়তে এসব ইলিশ বিক্রির জন্য তোলা হচ্ছে।
এদিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগস্টে ইলিশ আমদানির পরিমাণ জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেড়েছে। জুলাই মাসে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ আমদানি হলেও আগস্টে সেই পরিমাণ বেড়ে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজিতে পৌঁছায়। বিপুল পরিমাণ এই ইলিশের একটি অংশ যশোরের বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বড় বাজারের মাছ ব্যবসায়ী ও মেসার্স শেখ পিয়ারু ফিসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ পিয়ারু বলেন, তার জানা মতে এসব ইলিশ বার্মা বা মিয়ানমার থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসছে।
দেশি ইলিশের ব্যবসায়ী সত্যপদ, এরশাদ ও মো. আলমগীরসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, কম দামে তুলনামূলক বড় আকারের বিদেশি ইলিশ বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি কমেছে। দাম কম হওয়ায় ক্রেতাদের একটি বড় অংশ বিদেশি মাছের দিকে ঝুঁকছেন। এতে দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদেশি ইলিশকে দেশি মাছ হিসেবে বাজারজাত করা হলে একসঙ্গে দুই ধরনের ক্ষতি তৈরি হচ্ছে। একদিকে ভুল তথ্যের কারণে ক্রেতারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে বিদেশি মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরা বাজার হারাচ্ছেন।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, বাজারে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। তবে আমদানি করা মাছ ব্যবসায়ীরা দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রি করলেও মৎস্য আইনের আওতায় এ বিষয়ে সরাসরি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. সেলিমুজ্জামান বলেন, আমদানি করা ইলিশ অবশ্যই আমদানি করা মাছ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিক্রি করতে হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করা হবে।
