আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৭ জন নেতার বিরুদ্ধে যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই একতরফা, পক্ষপাতদুষ্ট ও সাজানো রায়কে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। আওয়ামী লীগ মনে করে, এই বিচারিক প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের মৌলিক ও সর্বজনস্বীকৃত নীতিগুলোর প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা হয়েছে, যা আইনের শাসনের পরিবর্তে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকেই প্রতিষ্ঠিত করে।
শুধু এই রায় নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর সকল কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পূর্ণ বেআইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে লংঘন করে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, অর্ডিন্যান্স এর মাধ্যমে সংশোধন করে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়াটিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি প্রতিশোধ মূলক ‘জুডিশিয়াল কিলিং সিস্টেমে’ পরিণত করেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য, ড. ইউনূসের বেআইনি সরকার জামাতে ইসলামী ও বিএনপির পদধারী ও সক্রিয় কর্মীদের সমন্বয়ে প্রসিকিউশন ও বিচারিক প্যানেল তৈরি করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা ও বেআইনি মামলা দায়ের করে যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অসত্য তথ্যের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে।
আজকের রায়ের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হরণ (Right to a Fair Trial & Adequate Time to Prepare Defense) করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি হলো যেকোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ থাকতে হবে। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের সংগৃহীত প্রমাণাদি প্রকাশের মাত্র তিন সপ্তাহ পর বিচার শুরু করা হয়েছে, যা আসামিপক্ষের কার্যকর আইনি প্রস্তুতি নেওয়ার মৌলিক অধিকারকে নির্মমভাবে সংকুচিত করেছে।
রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলায় যেসব ডিজিটাল সাক্ষ্য উপস্থাপন করেছে তা আন্তর্জাতিক আদালতের সাক্ষ্য মানদণ্ড ও ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশনের নীতিমালা লঙ্ঘন করে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার কোন সাক্ষ্য মূল্য নেই। এই সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশিত রায় প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সকল কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে ও রাষ্ট্রপক্ষের দাখিলকৃত সাক্ষ্য প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের বক্তব্যে বহু ক্ষেত্রে হুবহু কপি-পেস্ট করা ভাষা ও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে, যা সাক্ষ্যপ্রমাণের সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সাক্ষ্য প্রমাণের সত্যতা যাচাই ব্যতিরেকে এ ধরনের সাজা প্রদান সম্পূর্ণ বেআইনি।
ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষ প্রতিনিয়ত আসামিপক্ষের আইনজীবীদের হুমকি ধামকির মাধ্যমে তাদের অধিকার সীমাবদ্ধ করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আসামিপক্ষের আইনজীবীদের স্বাধীনভাবে সাক্ষীদের জেরা করার এবং সমকক্ষ আইনি লড়াই করার পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে। অথচ বর্তমান ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে, যা নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মূল ধারণার পরিপন্থী।
আজকে যাদের বিরুদ্ধে এই রায় প্রকাশিত হয়েছে তারা কেউই ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থিত ছিলেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের মৌলিক মানদণ্ড হলো আসামীর অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারগুলোতেও (Trial in absentia) আসামির নিজ পছন্দমতো আইনজীবী নির্বাচনসহ ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান ট্রাইব্যুনালে এই সুরক্ষাগুলো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।
জাতিসংঘের আরবিট্রারি ডিটেনশন সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ মনে করে, আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ড লংঘন করে প্রসিকিউটরদের কোনো সুনির্দিষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং আটক ব্যক্তিদের মাসের পর মাস সুনির্দিষ্ট লিখিত কারণ ছাড়াই আটকে রাখা হচ্ছে, যা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এছাড়া পৃথক আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের অধিকার থেকেও অভিযুক্তদের বঞ্চিত করা হয়েছে।
আজকের রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল তার বিচারিক ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে শাস্তি প্রদান করেছে। ১৯৭৩ সালের আইনে কোন অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার শাস্তি উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও, আজকের রায় সম্পূর্ণ অসংবিধানিক ও বেআইনিভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছে- যা বিচারকদের প্রতিহিংসা মূলক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘ ইতিপূর্বেই এই ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্পষ্ট ভাষায় বলতে চায়, যে মহৎ উদ্দেশ্যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারার্থে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল, বর্তমান অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক সরকার সেই পবিত্র উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক জিঘাংসা চরিতার্থ করতে এবং একমাত্র আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ও নিশ্চিহ্ন করতে এই ট্রাইব্যুনালকে যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ও মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃত নীতিগুলোকে পদদলিত করে রাজনৈতিক আজ্ঞাবহ আদালতে দেওয়া এই মিথ্যা ও বানোয়াট রায়ের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, অদূর ভবিষ্যতে দেশের আপামর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সেদিন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জুলাই-আগস্টের সকল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ও নিরপেক্ষ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। বর্তমান ও অতীত মিলিয়ে এই ধরনের সকল সাজানো রায়, মিথ্যা মামলা এবং বিচারিক প্রহসনকে দেশের জনগণ আইনি ও রাজনৈতিকভাবে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে। দেশবাসী আজ সেই ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের অপেক্ষাতেই রয়েছে।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
আঁধার কেটে ভোর হোক
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
