বিশ্বজিৎ রায়
আমরা মূলত সুযোগের অভাবে চরিত্রবান। বাংলাদেশের নিয়ম হচ্ছে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ। এই কারণে দেশটার কোনো উন্নতি নাই। গুজরাটের এই ইলিশটার দিকে একবার তাকান।
সীমান্ত পার হওয়ার সময় এই মাছের দাম পড়েছে মাত্র ১৯৬ টাকা ৪২ পয়সা কেজি।
এই সংখ্যাটা কোনো অনুমান নয়, আমদানীকৃত খোদ কাস্টমসের কাগজে লেখা।
গুজরাটি এই মাছটি সরাসরি গুজরাট এবং হাওড়া পাইকারি বাজার থেকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমদানি করছে গত দুই থেকে তিন মাস ধরে।
গুজরাটি ভাষায় ইলিশ জাতের এই মাছকে বলা হয় পালভা (পুরুষ মাছ) এবং মোদেন (স্ত্রী মাছ)।
স্ত্রী ইলিশকে সেখানে ‘মোদেন’ বা ‘মোদার’ বলা হয় এবং কমবয়সী পুরুষ ইলিশকে ‘পালভা’ বলা হয়।
একই মাছ তেলুগু ভাষায় পোলাসা এবং পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চলে পাল্লু মাছি নামে পরিচিত।
এই মাছ ধরা হয় গুজরাটের ভারুচ অঞ্চল এবং পশ্চিম উপকূলীয় এলাকা থেকে।
মূলত নর্মদা নদীর মোহনা ও খাম্বাত উপসাগর ঘেঁষা সমুদ্র এলাকায়।
বেনাপোল দিয়ে আসা এই ইলিশ যখন বাজারে ঢোকে, তখন কারো গায়ে লেখা থাকে না এটা কোথাকার মাছ।
ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটাই নেন।
আমদানি করা মাছকে পদ্মার, চাঁদপুরের, বরিশালের কিংবা চট্টগ্রামের ইলিশ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
যে ক্রেতা সন্তানের মুখে দেশি ইলিশ তুলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাজারে যান, তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই একই আমদানি করা মাছ, শুধু দামটা দেশীয়।
কারণ আমদানি করা মাছ তখন দেশীয় মাছ হয়ে যায়। আর সামান্য দুই চারশো টাকা দাম কমিয়ে বলে সাগরে মাছ এর আমদানি বেড়েছে, তাই দাম কমেছে।
এবার বেনাপোল কাস্টমস্ এর খাতা থেকে আসল হিসাবটা দেখা যাক।
জুলাই মাসে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকায়।
মানে প্রতি কেজির দাম পড়েছে মাত্র ১২০ টাকা ৫৪ পয়সা।
আগস্টে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজিতে, মূল্য ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
প্রতি কেজির দাম তখন ২০৩ টাকা ৩৩ পয়সা।
গড়ে কেজিপ্রতি দাম দাঁড়ায় মাত্র ১৯৬ টাকা ৪২ পয়সা।
অথচ এই মাছটা আপনি শেষ বার কত টাকা দিয়ে বাজার থেকে কিনেছেন?
তাছাড়া লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন, বেহিসাবি লাভের কারণেই দুই মাসে এই বিপুল আমদানি।
যা প্রায় ৩৫২ দশমিক ৭৯ টন।
তবে ভারতীয় গণমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা ও হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে এই একই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে মোট প্রায় ৫০০ টন ইলিশ যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা সরকারি কাস্টমস হিসাবের চেয়ে বেশি।
এইবার পোস্টে দেওয়া ছবিটির দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখুন, কী নির্মমভাবে কাটা হয়েছে মাছটি।
কেনো? কারণ নির্লজ্জের মতো টাকা কামাতে আর তর সইছে না।
পেট চিরে ডিম আলাদা করা হয়েছে।
মাথা কাটা হয়েছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে লোহার পাটাতন।
এই ডিম আলাদা করে পরে বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার টাকা কেজি দরে।
আর বাকি কাটা মাছ?
সেটা আর খোলা বাজারে নেই।
সেটা এখন ঘুরছে ফেসবুকের ইনবক্সে, চোরাগোপ্তা মেসেজে, ছবি পাঠিয়ে দরদাম করে।
কোনো নির্দিষ্ট দাম নেই, কোনো রসিদ নেই, কোনো জবাবদিহি নেই।
যার যা মনে চায় সে দাম হাঁকছে, আর ক্রেতা কিনছেন খুশি মনে এই ভেবে যে, হাতে পেয়েছেন খাঁটি ইলিশ।
দুইশো টাকার মাছ এর ডিম যখন তিন হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হয়, আর তার মাঝখানে যে ব্যবধানটা তৈরি হয়, সেই ব্যবধানের নাম মুনাফা নয়, সেই ব্যবধানের নাম প্রতারণা।
আমি আওয়ামীলীগ চিনি না। আমি বিএনপি কে চিনি না।
ডক্টর ইউনুসের প্রতি অনেক ভরসা ছিলো, উনিও আমাদের সাধারণ মানুষের মুখে ঠিক দামে ইলিশ তুলে দেন নি কখনো?
তিনি এই বিষয়ে চিন্তা করেছেন বলেও মনে পড়ে না।
কিন্তু আমার মনে পড়ে ২০২১-২২ এর দিকে আমি সোয়ারী ঘটে গিয়ে ৫৫০ টাকা দিয়ে ৭০০ গ্রামের ইলিশ এনে খেয়েছিলাম।
জীবনে কখনো নিজ হাতে মাছ কিনি নি, তারপরেও তিন কেজি মাছ পাইকারি বাজার থেকে কি সহজেই না কোন এনে ছিলাম।
আহ্, সেই কি স্বাধ। এখনও মুখে লেগে আছে যেনো।
তারপর আব্বুকে নিয়ে গিয়েছিলাম সাথে করে।
১ কেজির ইলিশ চার পাঁচটি কিনে এনেছিলাম, মোট পাঁচ কেজি ছিল।
দাম ছিল ১০৫০ টাকা করে এক একটি মাছ।
আমি কোনো রাষ্ট্র প্রধানকে চিনি না। কোনো নেতার মিছিল মিটিংয়ে ও যাই নি কখনো।
আমি চিনি আমার পরিবারকে, তাদের জিহ্বা কি চাচ্ছে, সেটিকে।
কিন্তু আমি কি তাদের কথা চিন্তা করে ন্যায্য দামে বাজার থেকে কিছু কিনতে পারছি?
আমাকে কেনো এই রক্তমাখা কাটা মাছের ছবির দিকে তাকাতে হবে?
আমি কেনো এইগুলো খাবো, তাও এতো দাম দিয়ে?
এই জন্য কি আমি ভোট দিয়েছিলাম, যেনো ইতিহাসে প্রথম বারের মতো ভারত থেকেও ইলিশ নামের এই বীভৎস মাছ আমদানি করা হয়?
আর এই স্বাধবিহীন মাছ সস্তায় আমদানি করে শেষ পর্যন্ত উচ্চমূল্যে আমাদের পাতে দেওয়া হয়?
একটা রক্তমাখা কাটা মাছের ছবি আজ বলে দিচ্ছে, ইলিশ নিয়ে যে গল্প আমরা বিশ্বাস করে খাচ্ছি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য এক বাস্তবতা।
এর পরেও আপনি খাবেন?
হ্যাঁ, খাবেন কারণ আমরা বাংলাদেশিরা সবাই এইরকমই।
এই রক্তমাখা কাটা ইলিশের মতো।
