ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
একজন প্রবাসী বাংলাদেশির একটি সাধারণ দিনের কথা ভাবুন। সকালে ঘুম ভাঙে নিউজার্সির কোনো শহরতলিতে। ঘড়িতে আমেরিকান সময়। বাইরে গাড়ির শব্দ, ব্যস্ত রাস্তা, অফিসে যাওয়ার তাড়া। ঘুম থেকে উঠেই হাতে আসে মোবাইল ফোন। একবার স্ক্রল করতেই ঢাকার রাজনীতি, সিলেটের বন্যা, গ্রামের বাড়ির পাশের নদীর ভাঙন, কিংবা কোনো আত্মীয়ের ফেসবুক পোস্ট।
অফিসে সারাদিন ইংরেজি। হিসাব ডলারে। গাড়ি চলে আমেরিকান রাস্তায়। কিন্তু রাতে ঘরে ফিরে টেলিভিশন খুললে, কিংবা ইউটিউব বা মোবাইলের পর্দায় খবর দেখতে বসলে ভাষাটা আবার বাংলা।
এই মানুষটি আসলে একই সঙ্গে দুটি দেশে বাস করেন। একটি দেশের ঠিকানা তাঁর পাসপোর্টে। আরেকটি দেশের ঠিকানা তাঁর বুকের ভেতরে। এই দ্বৈত জীবনযাপনের নামই হয়তো প্রবাস।
তবে প্রবাস শুধু ভৌগোলিক দূরত্বের নাম নয়। এটি এক ধরনের মানসিক অবস্থাও। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও যে মানুষটি প্রতিদিন বাংলাদেশের খবর খোঁজেন। দেশের রাজনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, গ্রামের বাড়ির কারও অসুস্থতার খবর শুনে রাত জেগে থাকেন। কিংবা ঈদের সকালে ঢাকা-সিলেটের ছবি দেখে হঠাৎ মন খারাপ করেন—তিনি আসলে দেশ থেকে পুরোপুরি দূরে নন।
শরীরটা বিদেশে। মনটা অনেক সময় এখনো দেশে। এই দুই সত্তার মাঝখানে যে সেতুটি প্রতিদিন নীরবে টিকে থাকে, তার একটি বড় অংশ তৈরি করেছে প্রবাসের বাংলা সংবাদমাধ্যম। এই মানুষগুলোর কথা আমরা খুব বেশি বলি না।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে কথা বললে আমরা সাধারণত রেমিট্যান্সের হিসাব করি। কত বিলিয়ন ডলার দেশে গেল, কতজন বাংলাদেশি বিদেশে আছেন, কোন দেশে কতজন—এসব সংখ্যা সামনে আসে। কিন্তু একটি জাতি যখন দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু টাকা দিয়ে তার সঙ্গে দেশের সম্পর্ক টিকে থাকে না।
টিকে থাকে ভাষায়। স্মৃতিতে। সংস্কৃতিতে। আর সংবাদে। বাংলাদেশের বাইরে যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, তাকে আমরা কমিউনিটি বলি। শব্দটি ছোট। কিন্তু এর ভেতরের পৃথিবী বিশাল। লন্ডনের ব্রিকলেন থেকে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিনের কেনসিংটন থেকে টরন্টো, প্যারিস, রোম, মিলান, সিডনি, মেলবোর্ন, দুবাই, আবুধাবি কিংবা রিয়াদ—যেখানেই বাংলাদেশিরা গেছেন, সেখানেই তাঁরা শুধু ঘর বানাননি। সঙ্গে নিয়ে গেছেন ভাষা, খাবার, গান, ধর্ম, স্মৃতি এবং দেশের সঙ্গে যোগাযোগের এক অদৃশ্য সুতো। এই সুতো ধরে রাখার অন্যতম কাজ করেছে বাংলা সংবাদমাধ্যম।
এর ইতিহাসও নতুন নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের আগেই ব্রিটেনে প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের ভাষায় খবর জানার এবং খবর জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে প্রকাশিত হয় জনমত। তখন বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হচ্ছে। ব্রিটেনে বসে বাঙালিরা দূরের দেশের খবর জানতে চাইছেন, নিজেদের সমাজকে সংগঠিত করতে চাইছেন, আবার নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বও প্রকাশ করতে চাইছেন। *জনমত*-এর জন্ম সেই প্রয়োজন থেকেই।
তারপর এল ১৯৭১। দেশের ভেতরে সংবাদে সেন্সরশিপ, বাইরে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। লন্ডনের মতো শহরে প্রবাসী বাঙালিরা খবর সংগ্রহ করলেন, ছড়িয়ে দিলেন, আন্দোলন সংগঠিত করলেন। জনমত-এর পুরোনো সংখ্যাগুলো আজও সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তখন শুধু বাংলাদেশের ভূখণ্ডে হচ্ছিল না। তার একটি রাজনৈতিক ও জনমত গঠনের লড়াই চলছিল লন্ডনের রাস্তায়ও।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সংবাদমাধ্যম একা ইতিহাস তৈরি করেনি। ব্রিটিশ মূলধারার সংবাদপত্র, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং সাধারণ মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু প্রবাসী বাঙালিদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার যে কাজটি হয়েছিল, সেটি ছিল একেবারেই আলাদা।
কারণ নিজের ভাষায় নিজের মানুষের খবরের যে আবেগ, অন্য ভাষায় তার পুরো অনুবাদ হয় না। স্বাধীনতার পর এই সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। প্রবাসী কমিউনিটি বড় হয়েছে। মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে নতুন দেশে। নতুন প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে বিদেশে। প্রতিটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্বও একটু একটু করে বেড়েছে। এই দূরত্ব কমানোর কাজটাই করেছে বাংলা সংবাদমাধ্যম।
একসময় ছিল ছাপা কাগজ। তারপর অনলাইন। টেলিভিশন। রেডিও। এখন সামাজিক মাধ্যম, ইউটিউব, পডকাস্ট, লাইভ স্ট্রিমিং—প্রবাসী সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম বদলেছে, কিন্তু প্রয়োজনটা বদলায়নি।
আজ নিউইয়র্কে একটি বাংলা সংবাদপত্রের অফিসে হয়তো দিনের বেলায় একজন সাংবাদিক কাজ করছেন, আর রাতের দিকে একই অফিসে কেউ বসে ঢাকার খবর সম্পাদনা করছেন। লন্ডনে কেউ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের খবর করছেন, আবার সেই একই সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদন যাচ্ছে। সিডনিতে কেউ কমিউনিটির অনুষ্ঠান কাভার করছেন, দুবাইয়ে কেউ শ্রমিকের সমস্যার খবর করছেন।
অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা পূর্ণকালীন সাংবাদিক নন। কারও ব্যবসা আছে। কারও চাকরি আছে। কারও সংসার আছে। দিনের কাজ শেষ করে রাতে সাংবাদিকতা করেন। কেউ ক্যামেরা নিজে ধরেন, নিজেই সাক্ষাৎকার নেন, নিজেই সম্পাদনা করেন, নিজেই খবর পোস্ট করেন। প্রবাসী সাংবাদিকতার এই অংশটুকু বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না। একটি খবরের পেছনে কখনো একজন মানুষের পুরো রাত চলে যায়। কখনো নিজের গাড়ির মাইলেজ। কখনো নিজের পকেটের টাকা। কখনো পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সময়। কখনো কাতে নির্ঘুম রাত।
এই মানুষগুলোর অনেকেই সাংবাদিকতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এই পথে আসেননি। কমিউনিটিই তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়। কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে তাঁরা শিখেছেন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে। মৃত্যুর সংবাদ থেকে শিখেছেন সংবেদনশীলতা। কোনো রাজনৈতিক সভা থেকে শিখেছেন প্রশ্ন করতে। কোনো অভিবাসন সংকট থেকে শিখেছেন তথ্য যাচাই করতে। কোনো বিপদের রাতে শিখেছেন সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়—কখনো কখনো দায়িত্বও। প্রবাসী বাংলা সংবাদমাধ্যম তাই শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না। এটি আসলে প্রবাসী সমাজের একটি চলমান আর্কাইভ।
আজ যে খবরটি হয়তো দুই কলামের একটি প্রতিবেদন, বিশ বছর পরে সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি কমিউনিটির ইতিহাস। কে প্রথম কাউন্সিলর হলেন। কে প্রথম পার্লামেন্টে গেলেন। কোন মসজিদটি কীভাবে গড়ে উঠল। কোন ব্যবসায়ী প্রথম দোকান খুললেন। কোন অভিবাসী সংগঠন বন্যার সময় দেশে টাকা পাঠাল।
কোন পরিবার তাদের সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাল। কোন তরুণী প্রথম নেতৃত্বে এলেন। কোন বৃদ্ধ মানুষটি পঞ্চাশ বছর পর দেশে ফিরে গেলেন।
এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই একদিন বড় ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের ইতিহাসে হয়তো এসবের জায়গা হয় না।
কিন্তু কমিউনিটির ইতিহাসে এগুলোই সব। একজন বাবা তাঁর সন্তানকে বাংলা শেখাতে পারেন না হয়তো। কিন্তু তাঁর সন্তানকে বাংলা সংবাদ দেখাতে পারেন। একজন মা দেশের জন্য মন খারাপ করলে ফোনে বাংলাদেশের খবর দেখতে পারেন। একজন তরুণ, যে বাংলাদেশে কখনো বড় হয়নি, সে বাংলা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারে তার বাবা কেন সিলেটের কথা বললে চুপ হয়ে যান। এভাবেই সংবাদ কখনো কখনো রক্তের সম্পর্কেরও কাজ করে।
এটি স্মৃতি বহন করে। পরিচয় বহন করে। কখনো কখনো একটি পুরো প্রজন্মকে বহন করে। এই জায়গায় এসে আমাদের একটু অস্বস্তিকর প্রশ্নও করতে হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রবাসীদের কথা বলে অনেক। রেমিট্যান্সের সময় বলে। প্রবাসী কল্যাণের সময় বলে। ভোটের সময় বলে। বিমানবন্দরে হয়তো বলে—প্রবাসীরাই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি করে যে সংবাদমাধ্যম, তার কথা কতটা বলে?
রাষ্ট্রের দূতাবাস আছে। কনস্যুলেট আছে। সাংস্কৃতিক আয়োজন আছে। সরকারি প্রচার আছে। কিন্তু প্রবাসী সমাজের ভেতর থেকে নিজেরাই যে সংবাদমাধ্যম তৈরি করেছে, তাদের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তা কোথায়? আমি এখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণের কথা বলছি না। বরং তার বিপরীত কথা বলছি।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেই প্রশিক্ষণ, সাংবাদিকতা ফেলোশিপ, ডিজিটাল নিরাপত্তা, আর্কাইভ সংরক্ষণ, তরুণ সাংবাদিকদের জন্য বৃত্তি এবং গবেষণার সুযোগ তৈরি করা যায়। কারণ রাষ্ট্রের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক মানেই নিয়ন্ত্রণ নয়। সহযোগিতাও হতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার প্রয়োজন আরও বেশি। কারণ তাঁদের সামনে একসঙ্গে দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ। একদিকে বাংলাদেশকে বোঝা। অন্যদিকে যে দেশে বাস করছেন, সেই দেশের আইন, সমাজ ও রাজনীতিকে বোঝা।
তার ওপর আছে ডিজিটাল যুগের নতুন ঝুঁকি—ভুয়া খবর, ভুল তথ্য, অনলাইন হয়রানি, সাইবার আক্রমণ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি।
আগের প্রজন্মের সাংবাদিকের হাতে ছিল ছাপার মেশিন। আজকের সাংবাদিকের হাতে মোবাইল ফোন। কিন্তু দায়িত্বটা কমেনি। বরং বেড়েছে। কারণ এখন ভুল খবর ছড়াতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। প্রবাসী বাংলা সংবাদমাধ্যমের সামনে তাই শুধু টিকে থাকার প্রশ্ন নয়—বিশ্বাসযোগ্য থাকার প্রশ্নও আছে। এখানেই পেশাদার সাংবাদিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কমিউনিটির আপনজন হওয়া ভালো। কিন্তু সাংবাদিকের কাজ শুধু আপনজনের কথা বলা নয়; সত্য কথাটাও বলা। প্রবাসী সংবাদমাধ্যমকে একই সঙ্গে কমিউনিটির বন্ধু এবং সমাজের আয়না হতে হবে। এই ভারসাম্য সহজ নয়। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই করতে হবে। কারণ আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আজকের চেয়েও বড়।
আজ যারা প্রবাসে বাংলা সংবাদমাধ্যম চালাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ব্যক্তিগত। তাঁদের শৈশব বাংলাদেশে। তাঁদের স্মৃতি বাংলাদেশে। তাঁদের ভাষা বাংলাদেশের। কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম? চতুর্থ প্রজন্ম? যে সন্তান জন্মেছে নিউইয়র্কে, বড় হয়েছে লন্ডনে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে টরন্টোতে, চাকরি করছে সিডনিতে—তার কাছে বাংলাদেশ কী?
একটি দেশ? একটি ভাষা? নাকি দাদা-নানার গল্প?
সেই জায়গায় সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমরা যদি চাই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি জীবন্ত সম্পর্ক টিকে থাকুক, তাহলে শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতিতে আটকে থাকলে হবে না। বাংলা সংবাদমাধ্যমকেও নতুন প্রজন্মের ভাষা বুঝতে হবে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। তাদের গল্প বলতে হবে।
বাংলাদেশের গল্পও তাদের কাছে নতুনভাবে বলতে হবে। কারণ পরিচয় জোর করে উত্তরাধিকার হিসেবে দেওয়া যায় না। পরিচয়কে জীবন্ত রাখতে হয়। কথায়। গল্পে। সংবাদে। স্মৃতিতে। আমরা প্রায়ই বলি, দেশের বাইরে আরেকটি বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে। কথাটা সত্যি।
কিন্তু সেই বাংলাদেশ শুধু দোকান, রেস্টুরেন্ট, মসজিদ, সংগঠন কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তৈরি হয়নি। তার একটি সংবাদপত্র আছে। তার একটি ক্যামেরা আছে। তার একটি মাইক্রোফোন আছে। তার একটি নিউজরুম আছে। আছে কিছু অদ্ভুত মানুষ—যারা দিনের কাজ শেষে রাত জেগে খবর লেখেন।
কেউ তাঁদের খুব বেশি চেনে না। কেউ তাঁদের নাম মনে রাখে না। কোনো কোনো দিন তাঁদের নিজের পরিবারও হয়তো প্রশ্ন করে—এত রাতে এখনো কাজ করছ কেন? তাঁরা হয়তো উত্তর দেন না। কারণ তাঁরা জানেন, আজকের খবরটি কালকের ইতিহাস হতে পারে। দেশের বাইরে ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশকে যদি একটি বিশাল বৃক্ষ ধরি, তাহলে রেমিট্যান্স তার অর্থনৈতিক শিকড়ের একটি অংশ। ব্যবসা তার ডালপালা। সংগঠন তার সামাজিক কাঠামো। সংস্কৃতি তার ফুল।
আর সংবাদমাধ্যম? সংবাদমাধ্যম হয়তো সেই গাছের স্মৃতি। সে বলে—আমরা কোথা থেকে এসেছি।
আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আর কোন দিকে যাচ্ছি। একদিন হয়তো প্রবাসী বাংলা সংবাদমাধ্যমের এই সময়টাও ইতিহাস হয়ে যাবে। পুরোনো খবরের কাগজ খুলে কেউ দেখবে—একদল মানুষ ছিল, যারা নিজেদের জীবন দিয়ে দূরদেশে বাংলাদেশের খবর বয়ে নিয়ে বেড়াত। তখন হয়তো তাদের অনেকের নাম আর মনে থাকবে না। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া খবরগুলো থাকবে। একটি পুরোনো সাইনবোর্ডের মতো। একটি হলুদ হয়ে যাওয়া সংবাদপত্রের পাতার মতো। কোনো পুরোনো ভিডিওর শব্দের মতো।
সেখানে লেখা থাকবে — বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশ একদিন শুধু তৈরি হয়নি। তাকে প্রতিদিন মনে রাখা হয়েছিল। সেই মনে রাখার কাজটি করে গিয়েছিলেন কিছু মানুষ, যাদের হাতে ছিল কলম, ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন। তাঁরা হয়তো ইতিহাসের বড় চরিত্র নন। কিন্তু ইতিহাসকে ধরে রাখার কাজে তাঁদের ভূমিকা ছোটও নয়। কারণ একটি জাতি শুধু তার ভূখণ্ডের মধ্যে বাস করে না। কখনো কখনো একটি জাতি বাস করে তার মানুষের স্মৃতিতে। সেই স্মৃতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঠিকানাগুলোর একটি— তার সংবাদমাধ্যম।
লেখক: সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা
