বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি আবার সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? নাকি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে তৈরি হচ্ছে এমন রাজনৈতিক অনুমান? মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হঠাৎ সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক, জাতিসংঘ অধিবেশনের সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলাদা বৈঠক না হওয়া, জ্বালানি তেলের বড় মূল্যবৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে চলমান উদ্বেগ, সব মিলিয়ে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো তথ্যই সরাসরি সামরিক শাসন আসন্ন বলে প্রমাণ করে না।
২১ সেপ্টেম্বর সেনাসদরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসাও করেন। বৈঠকের প্রকাশিত বিবরণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বা সরকার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার কোনো উল্লেখ নেই।
তারপরও বৈঠকটির সময়কাল রাজনৈতিকভাবে নজর কাড়ছে। কারণ একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নির্ধারিত হয়নি। এই দুই ঘটনাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তাই এটিকে ওয়াশিংটনের কোনো রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের বদলে একটি অনুমান হিসেবেই দেখতে হবে।
দেশের ভেতরে সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে। সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকায় উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে সরকার কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। রয়টার্স বলছে, এই মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো কয়েক ধরনের চার্জ প্রায় ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে এবং কৃষি অর্থনীতিবিদরা ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সেচ, যান্ত্রিক কৃষিকাজ ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন।
এখানেই ফিরে আসে ইতিহাস।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সামরিক হস্তক্ষেপ নতুন ঘটনা নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশে সামরিক আইন শুরু হয় এবং প্রায় চার বছর তা বহাল ছিল। আবার ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংসদ ভেঙে ক্ষমতা গ্রহণ করে সামরিক আইন জারি করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত এসব সামরিক শাসনের বৈধতা দেওয়ার সাংবিধানিক প্রচেষ্টাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়।
তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত-সেনাপ্রধান বৈঠককে সামরিক ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে দেখানোর মতো তথ্য নেই। একইভাবে ট্রাম্প-তারেক আলাদা বৈঠক না হওয়াও সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থা যদি তীব্র হয়, জননিরাপত্তা নিয়ে আস্থা আরও কমে, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ে এবং বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাসের কারণে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা বাড়বে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসা অস্বাভাবিক নয়।
এই মুহূর্তে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন “সামরিক শাসন আসছে কি না” নয়, বরং এমন কোনো রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কি না, যা অতীতে বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করেছিল।
এখন পর্যন্ত তার উত্তর নিশ্চিতভাবে “হ্যাঁ” বলার মতো তথ্য নেই। কিন্তু সেনাপ্রধানকে ঘিরে কূটনৈতিক যোগাযোগ, সরকারের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আগামী দিনগুলোতে এই চারটি সূচকের গতিপথই সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে চলমান জল্পনার বাস্তব ভিত্তি আছে কি না, তা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
