ফেব্রুয়ারি ১৯৭২-এ কলকাতার রাজভবনে ধারণকৃত এই ঐতিহাসিক ছবিটি মূলত কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের এক অনন্য দলিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর, সদ্য স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারতের কলকাতায় যান। সেই সফরে কলকাতার রাজভবনে (তৎকালীন রাজ্যপাল এ এল ডায়াসের বাসভবন) অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কবি নজরুলের পরিবারের এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
নিচে এই ছবির প্রেক্ষাপট ও এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. ছবির মূল প্রেক্ষাপট (ঐতিহাসিক পটভূমি):
বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক উদ্যোগ:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা সফরের সময় অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে কবি নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
পারিবারিক আলোচনা:
কবি তখন সম্পূর্ণ বাকরহিত এবং অসুস্থ ছিলেন। তাই কবিকে কীভাবে ঢাকায় নেওয়া হবে, তাঁর চিকিৎসা এবং দেখাশোনার দায়িত্ব কীভাবে সুনিশ্চিত করা হবে—তা নিয়ে আলোচনার জন্য রাজভবনে নজরুলের দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ এবং অনিরুদ্ধের স্ত্রী কল্যাণী কাজী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
২. ছবিতে উপস্থিত ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা ও গুরুত্ব:
ব্যক্তিত্ব:
ছবিতে তাঁর অবস্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। তিনি কবি নজরুলকে বাংলাদেশে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত করার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ও পরিকল্পনাকারী। কাজী সব্যসাচী কবি নজরুলের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী। তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কাজী অনিরুদ্ধকবির কনিষ্ঠ পুত্র এবং পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা সঙ্গীতজ্ঞ ও প্রখ্যাত গিটারবাদক। তিনি নজরুলের অমূল্য সুর ও গান সংরক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। কল্যাণী কাজী কাজী অনিরুদ্ধের স্ত্রী এবং নজরুলের পুত্রবধূ। তিনি প্রখ্যাত নজরুল সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক ছিলেন, যিনি পরবর্তীতে নজরুলের স্মৃতি রক্ষার্থে বড় ভূমিকা পালন করেন।
৩. ছবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ফলাফল:
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি:
বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন যে, নজরুল কেবল পশ্চিমবঙ্গের নন, তিনি পূর্ব বাংলার মানুষেরও সমান অধিকার ও আবেগের জায়গা। এই বৈঠকের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছাড়া অসম্পূর্ণ।
সপরিবারে বাংলাদেশে আগমন:
রাজভবনের এই ফলপ্রসূ আলোচনার সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের অনুমতি সাপেক্ষে ১৯৭২ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ, কবির জন্মদিনে) কবি নজরুলকে সপরিবারে সরকারি উদ্যোগে ঢাকায় আনা হয়।
জাতীয় কবির স্বীকৃতি:
ঢাকায় আনার পর কবিকে ধানমন্ডিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাসস্থান (বর্তমান নজরুল ইন্সটিটিউট/কবি ভবন) দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই ছবিটি কেবল চারজন মানুষের ফ্রেমবন্দি মুহূর্ত নয়, এটি একটি নতুন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্ধারণের এবং দুই দেশের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের প্রতীক।
তথ্য সংগ্রহ এবং ছবি এডিট: মৃণাল নন্দী
