সুষুপ্ত পাঠক
জুলাই সে যেমনই হোক তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়। নইলে দুধ কা দুধ পানি কা পানি হতে বহু বহু বছর লেগে যেতো। সবচেয়ে ভালো যা হয়েছে, একসময় আমরা যাদের সঙ্গে ব্লগিং করেছি, যাদেরকে ‘মুক্তমনা ব্লগার’ বলা হতো তাদের মধ্যে যে এত এত ‘মডারেট রাজাকার’ তা ২৪ না এলে জানাই হতো না!
আওয়ামী লীগ বিরোধীতা আর বাংলাদেশের জন্মের সনদ, মুক্তিযুদ্ধের নায়করা, ঐতিহাসিক স্থান, মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের সম্মান একদমই আলাদা জিনিস। ৫ আগস্টের পর থেকে পুরো বাংলাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের স্বাধীন হওয়া দেখে ৫ আগস্টের আগে যারা আওয়ামী লীগের পতনে উল্লাসিত ছিল, তারাও পক্ষ পরিবর্তন করতে এক মুহূর্ত দেরি করেনি। কিন্তু সমন্বয়কদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতা, যুদ্ধপরাধীদের মুক্তি, বাল কায়দার স্থানীয় মোল্লাদের ৫ আগস্টে ভি চিহ্ন দেখিয়ে উল্লাস, জেল থেকে পাইকারী হারে জঙ্গিদের মুক্তি, প্রতিটি মুক্তিযুদ্ধে ভাস্কর্য ভেঙে গুড়ো গুড়ো করা দেখেও এরা ছিল নির্বিকার। তখনো তারা শেখ হাসিনা কত খারাপ, ভারত কত খারাপ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ব্যবসা কত খারাপ, শেখ মুজিব কত বড় স্বৈরাচার… রোজ ঘন্টায় ঘন্টায় পোস্ট করে সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে।
কোন লোক মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিন্দু পরিমাণ অনুভূতি নিজের মধ্যে রাখলে ৩২ নম্বরের মত ঐতিহাসিক সাক্ষী একটি বাড়ি ভাঙার পরও জুলাইপন্থী থাকতে পারে? ইনুসের মত দেশ বিক্রিকারী যখন রিসেট বাটন টিপে মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলার কথা বলে তারপরও যারা জুলাইকে একটা চেতনা ধরে রাখে তারা ‘মডারেট রাজাকার’ নয়?
এক সময় মুক্তমনা ব্লগে মুক্তমনা ব্লগার নামে পরিচিতদের এতখানি জামাত সফটনেস দেখে একটুও অবাক হইনি বলাটা সঠিক হবে না। যেসব বাম মুক্তমনা ব্লগার ছিল তারা যে এতখানি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সেটাও কম বিস্ময় নয়। এদের অনেকেরই শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে রোজ যাতায়াত ছিল। যদি জুলাই না আসতো তাহলে এদের চেনা হতো না। হয়ত এদের নিজেদেরই জানা হতো না তাদের মধ্যে কতটা শুয়োরের বাচ্চা বাস করে! ফলে ২৪ এর শিবির ডিপস্টেট রেজিম চেঞ্জ গেইম অনেক দিক দিয়ে শাপেবর হয়েছে। স্পষ্টভাবে বিভাজন প্রকাশিত হয়েছে।
নাস্তিক হলেই সে সেক্যুলার হয় না এটা আমি বহুকাল আগে থেকে বলে আসছি। ধর্মকে অস্বীকার করে নাস্তিক আর শুধু কুরআন পড়ে মোল্লার মধ্যে তফাত খুব কম। একজন মানুষ তিনি যে মতেরই হোন সবার আগে তাকে ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। অর্থ্যাত রাষ্ট্রে সমাজে তিনি ধর্ম দিয়ে ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে কারোর পক্ষ নিবেন না। এমনকি রাষ্ট্রের বাইরে আন্তর্জাতিক যে কোন ইস্যুতেও তিনি ধর্মনিরপেক্ষ থাকবেন। বাংলাদেশের প্রসঙ্গে তাকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আপোষহীন হতে হবে কারণ এটি পাকিস্তানের মত সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের সঙ্গে আইনী সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল। না হলে এখনো আমাদের ঘৃণ্য ‘পাকিস্তানী’ পরিচয় বহন করতে হতো। একই সঙ্গে দ্বিজাতিতত্ত্বকে সচেতনভাবে অস্বীকার করা ছাড়া এই উপমহাদেশের কোন মানুষই অসাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আর কেউ যদি অসাম্প্রদায়িক না হয় তাহলে সে ‘মুক্তমনা’ কেমন করে হয়? আমাদের কথিত সেইসব মুক্তমনা ব্লগার বন্ধুরা, যাদের অনেকে ঠিক লেখক ছিলেন না, বেশিরভাগই সখে টুকটাক লিখতেন, কেউ কমেন্ট ব্লগার ছিলেন- তবু তাদের এক্টিভিজম ছিল- তারা ধর্মহীন, তারা কমিউনিস্ট, তারা ইউরোপীয়ান সাম্যবাদী যে রকম পরিচয়ই দেন না কেন- জুলাইয়ে তাদের অবস্থান তাদেরকে ‘লালবদর’ ছাড়া আর কিছুই প্রমাণ করেনি। ১৯৭১ সালের কুখ্যাত আল বদরের সঙ্গে মিল রেখে লাল বদর বলার অর্থ এটাই যে তারা সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত জুলাইবাদীদের সমস্ত কৃতকর্মকে হয় জাস্টিফাই করছেন নয়ত না দেখার ভান করে ক্রমাগত আওয়ামী লীগের গীবত করে যাচ্ছে।
বিদেশে থাকা এদের একটা বড় অংশই বাটপার। বাংলাদেশের হিন্দুদের এরা ব্লেম দেয়। জুলাই পরবর্তী হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ শুনলেই তারা সেখানে ফ্যাসিস্ট হাসিনার হয়ে ষড়যন্ত্র দেখতে পেতো। অথচ এরা নিজেরাই বিদেশে বাংলাদেশকে নাস্তিকদের জন্য ভয়ংকর এক দেশ দেখিয়েই আশ্রয় নিয়েছে। একজনকে চিনি সে নাস্তিক ছিল না, নাস্তিক ব্লগার কিলিংয়ের সময়ের বহু আগে সে ব্লগিং ছেড়ে দিয়ে ফান ম্যাগাজিনে ভাঁড়ামী করে বেড়াতো, সেও নিজেকে নাস্তিক সাজিয়ে আমেরিকায় ঠাঁই নিয়েছে। এখন বিশিষ্ট লাল বদর! এই রকম গন্ডায় গন্ডায় উদাহরণ দিতে পারি। কেউ বউযের যোগ্যতায়, কেউ স্রেফ একটা লিস্টে নাম উঠায় বিদেশে যেতে পেরেছিল। সেটা দোষের নয়। তা যাক। কিন্তু এরা এমন সুর ধরেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনার কারণেই তারা দেশছাড়া! তাহলে এখন এই আড়াই বছরেও তারা কেউ দেশে আসলো না কেন? বিদেশে আশ্রয় ছেড়ে পাকাপাকিভাবে দেশে আসুন! এখন তো ফ্যাসিস্ট নেই! জঙ্গি নেই! সমস্যা কি তাহলে?
লীগের আমলে অনেকেই নিরাপত্তা না পেয়ে দেশ ছেড়েছেন। এটি অস্বীকার করা যাবে না। সে জন্য লীগের প্রতি ক্ষোভ খুব স্বাভাবিক। লীগের মোল্লা তোষণ ও ব্লগার কিলিংয়ের সময় তাদের অসহযোগিতা নিয়ে লীগের বিরুদ্ধে আমার গত এক যুগের লেখালেখির সব রেকর্ডই রয়েছে। পড়ে দেখতে পারেন কেমন ছিল আমার আওয়ামী লীগের সমালোচনা। কিন্তু জুলাইতে রাজাকারদের ক্ষমতা গ্রহণ ও মুক্তিযুদ্ধকে দমন, আওয়ামী লীগের প্রতি অন্যায় একজন সংবেদনশীল লেখক ও মানুষ হিসেবে তাদের পক্ষই নিতে হবে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের উর্ধে যারা উঠতে পারে না তারা আবার কিভাবে নিজেদের ‘মুক্তমনা’ বলে দাবী করেন?
আমি নাম ধরে ধরে এই প্রবাসী বাটপারদের কথা বলতে পারি। তার কোন প্রয়োজন নেই। মানুষ সবাইকেই চিনেছে। বাকী জীবন এদের শিবিরের এক্টিভিস্টদের সঙ্গেই এক কাতার হবে। এর থেকে বের হবার তাদের আর সুযোগ নেই।
-সুষুপ্ত পাঠক
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
