নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গত ১৮ই আগস্ট চালু হওয়া বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ সেবা এক মাসের মধ্যেই যাত্রীস্বল্পতায় পড়েছে।
৭৫ আসনের দ্বিতল বাসগুলোতে গড়ে ১৫ জনের বেশি যাত্রী হচ্ছে না বলে সংস্থার দেওয়া তথ্য থেকে দেখা যায়। কিন্তু ১৩টি রুটে চলাচলরত ১৪টি বাসকে অপ্রতুল বিবেচনা করে দ্রুত আরও ১০০টি বাস চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—যাত্রী চাহিদা, সময়সূচি ও রুটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি।
বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৭ ও ৩০শে আগস্ট সংস্থাটির ১০টি ডিপো থেকে ১৪টি বাস ৩০টি ট্রিপ চালায়। ওই দুই দিনে ১ হাজার ৭৯২টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয় ২৭ হাজার ৪২ টাকা। বিপরীতে জ্বালানি, টোল ও কর্মীদের বেতন বাবদ ব্যয় ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৯ টাকা। ফলে দুই দিনে লোকসান দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ১০৭ টাকা—গড়ে দিনে প্রায় ৬১ হাজার টাকা।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি যাত্রী কিছুটা বাড়লেও আয়ে তেমন উন্নতি দেখা যায়নি। ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৩টি বাসের প্রতিটিতে গড় আয় ছিল মাত্র ১ হাজার ১৪৭ টাকা। ফলে যাত্রী কম থাকা অবস্থায় বহরে আরও বাস যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে: নতুন বাস নামানোর আগে বিদ্যমান সেবার সময়সূচি ও রুট ঠিক করা হচ্ছে কি না?
যাত্রীদের অভিযোগ, পিংক বাসের সময়সূচি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাতায়াতের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। বাসগুলো সকালে ও বিকেলে নির্ধারিত রুটে একবার করে চলে। কমলাপুর থেকে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে মিরপুর পৌঁছাতে বাসটির সময় লাগে সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট পর্যন্ত। ফলে অফিস ছুটির সময়ের যাত্রীরা ততক্ষণে অন্য বাসে উঠে পড়েন।
ঢাকার যানজটে নির্ধারিত সময় ধরে রাখা কঠিন হলেও বাসের অবস্থান জানার জন্য অ্যাপভিত্তিক লাইভ ট্র্যাকিং নেই। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে বাস না পেলে যাত্রীদের সাধারণ বাসে ফিরতে হয়।
যাত্রীদের একাংশের প্রস্তাব, একই ব্যয়ে বড় দ্বিতল বাসের বদলে একাধিক মিনিবাস চালালে ব্যস্ত সময়ে ট্রিপ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
নারীদের জন্য বিশেষ বাস চালুর উদ্যোগ ঢাকায় নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে ১৯৯৮, ২০০৯ ও ২০১৮ সালে—শেষবার ‘দোলনচাঁপা’ নামে—এ ধরনের সেবা চালু হয়েছিল। কিন্তু যাত্রীস্বল্পতা ও লোকসানের কারণে প্রতিটি উদ্যোগই পরে বন্ধ হয়ে যায়।
আগের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের গবেষণা যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে কি না, নতুন করে আরও ১০০ বাস চালুর সিদ্ধান্ত সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান উদ্যোগটিকে অপরিকল্পিত বলে মন্তব্য করেছেন।
তার মতে, আগের নারী বাসসেবাগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিয়ে মাঠপর্যায়ে যথাযথ গবেষণা করা প্রয়োজন ছিল। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী পিংক বাসে লোকসান থাকলেও যাত্রী চাহিদা ও পরিচালনব্যবস্থা পর্যালোচনার আগেই বহর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আরও জানানো হয়, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ মোড় ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেগুলো সোজা ও প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রকল্পগুলো সোজা রেখায় করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার কথাও বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
গত রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির প্রথম বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম।
এতে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, লুৎফর রহমান, মো. রুহুল আমীন দুলাল, মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান, নেওয়াজ হালিমা আরলী, মো. রফিকুল ইসলাম খান এবং মো. মতিয়ার রহমান। বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে যোগ দেন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান।
বৈঠকে কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের পরিচিতি হয়। পরে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নেওয়া পরিকল্পনা এবং চলমান উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়।
