তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের বাধা দূর করতে আলোচনা শুরু করেছে ঢাকা ও দিল্লি। ভারতের নয়া দিল্লিতে বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজিটি) ১৬তম বৈঠক শুরু হয়েছে। বৈঠকের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার আমদানি-রপ্তানির বাধা দূর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা ও একজন কূটনীতিক জানান, বাংলাদেশ মূলত বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে।
তিনি বলেন, আলোচনায় আরও ছিল পণ্য আমদানি-রপ্তানির চিহ্নিতকরণ এইচএস কোডের সামঞ্জস্য যাচাই, স্থলবন্দরের শুল্ক স্টেশনের মাধ্যমে বাণিজ্য সহজ করা, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতির বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল-সাফটার রুলস অব অরিজিনসহ নানা বিষয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতও সুতাসহ অন্যান্য পণ্যের ওপর বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার কথা বলেছে। এ ছাড়া দেশটির পক্ষ থেকে পণ্যের মান-সংক্রান্ত বিষয় এবং রেলপথ ও অভ্যন্তরীণ জলপথে পরিবহন বাড়ানোর প্রসঙ্গ তোলা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, নিয়মিত গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করার ব্যাপারে দুই পক্ষই ‘সম্মত’ হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা ও কূটনীতিক জানান, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও ভারতের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়া, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং ভারতের স্থলপথ ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ বৈঠকে তুলেছে।
অন্যদিকে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্ত হাট চালু, দুই দেশের রেল যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং ভারতীয় পণ্য আমদানিতে আরোপিত উচ্চ শুল্ক প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
দুই দিনের এই বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার।
দশ সদস্যের প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, এনবিআরের প্রতিনিধি হিসেবে বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ শামীম আলম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ফারহানা ইসলাম, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের যুগ্ম প্রধান মামুন-উর-রশিদ আসকারী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া-১) বাকী বিল্লাহ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মেরিনা সুলতানা এবং বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক ফিরোজ আহমেদ।
জেডব্লিউজিটির বৈঠক সাধারণত বছরে একবার হয়। সর্বশেষ ১৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭শে সেপ্টেম্বর, ঢাকায়। তার আগের ১৪তম বৈঠক বসেছিল ২০২২ সালের ২ ও ৩রা মার্চ, নয়া দিল্লিতে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দেয়, আর এই নিয়মিত বৈঠকও হয়নি।
ইতিমধ্যে ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। সমুদ্রপথে আমদানির সুযোগ অবশ্য খোলা রাখা হয়। কয়েক সপ্তাহ পর ভারত স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও পিভিসিসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই বছরের জুনে পাট ও কিছু বস্ত্রজাত পণ্যের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা আসে।
আগের বৈঠকগুলোতে আলোচনার বিষয় ছিল স্থলবন্দর ও ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টের অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দরসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, সীমান্ত হাট চালু, রেলপথে পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং পণ্যের মান সমন্বয় ও পারস্পরিক স্বীকৃতি।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (সিইপিএ) প্রস্তুতি ও যৌথ সমীক্ষা, বাংলাদেশে নিত্যপণ্য সরবরাহ এবং পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপোস্ট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে ছিল।
