গোয়েন্দা প্রতিবেদন হাতে আসার পর গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ১০টি ছাপাখানার মালিককে ডেকে পাঠান শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ডাকা মধ্যে ছিলেন সেই ব্যবসায়ীও।
মন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে সঠিক মানের সব পাঠ্যবই আমি চাই। যারা দিতে পারবে না তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ডিসেম্বরে চীন থেকে পাঠ্যবই ছাপিয়ে আনা হবে। এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামানের (রুবেল) কাছে পাঠ্যবই ছাপার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান শিক্ষামন্ত্রী।
জবাবে রুবেল বলেন, ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ ভাগ বই দেওয়া সম্ভব। বাকি ৫ ভাগ ছাপার জন্য তিনি সমিতির পক্ষ থেকে বাড়তি সময় চান। তখন উচ্চকণ্ঠে শিক্ষামন্ত্রীর প্রশ্ন, কেন ৩০শে নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই দেওয়া যাবে না? তিনি যৌক্তিক কারণ দেখাতে বলেন।
এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি রুবেল। বৈঠকে উপস্থিত আরেক ছাপাখানার মালিকের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনার প্রতিষ্ঠান থেকে কেন নিম্নমানের বই পাওয়া গেছে।’ ওই ছাপাখানার মালিক ভবিষ্যতে এমন আর হবে না বলে অঙ্গীকার করেন।
নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ করতে মুদ্রণ সমিতিকেও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। এদিকে গত বুধবারের মধ্যে ৫০ ভাগ পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ছাপা হয়েছে ৩০ ভাগেরও কম। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে ২০ ভাগ বই ছাপতে পারেনি ছাপাখানাগুলো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিবছর বই ছাপতে দেরি হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে নিম্নমানের কাগজে ছেপে বেশি মুনাফা করার প্রবণতা, কারণ শেষ মুহূর্তে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ কম থাকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ করতে আগ্রহী চীন। এমনকি একবছর বিনা মূল্যে সব পাঠ্যবই ছাপিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও তারা দিয়েছে।
পাঁচটি ছাপাখানার মালিকের বক্তব্য, এক শ্রেণির ছাপাখানার অতি মুনাফার লোভের কারণে হয়তো এই খাত বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। বর্তমানে এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে দুই লাখ মানুষের।
সিন্ডিকেটের দর নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি কেন চুপ ছিল, এ প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও প্রেস মালিকদের নিয়ে এবার একটি ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেট গড়েন এক ব্যবসায়ী। এ কারণেই টেন্ডার লাইভে থাকা অবস্থায় প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর মতো বিধিবহির্ভূত ঘটনা ঘটেছে। শুরুতে সরকার যে প্রাক্কলিত দর ঠিক করেছিল, তা ফাঁস হয়ে যায়।
ফাঁস হওয়া দর দেখে সেটি বাড়ানোর জন্য চাপ দেন সেই ঠিকাদার। অদৃশ্য কারণে সেই চাপ মেনে নিয়ে প্রাক্কলিত দর বাড়িয়ে দেয় এনসিটিবি, আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও নীরব থাকে। এরপর ঠিকাদাররা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে দরপত্র জমা দেন এবং কাজ ভাগাভাগি করে নেন। এভাবে সিন্ডিকেটটি ২৫২ কোটি টাকা গায়েব করেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এটি একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। প্রতিযোগিতাহীন এই উচ্চমূল্যের দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫ মানা হয়নি বলেও অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তথ্য সংগ্রহে ইতিমধ্যে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির আটটি, ষষ্ঠ শ্রেণির ১২টি, সপ্তম শ্রেণির ১০টি, অষ্টম শ্রেণির চারটি এবং নবম-দশম শ্রেণির ১১টিসহ মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে (৬৬.৬৬ শতাংশ) জমা পড়েছে মাত্র একটি করে দরপত্র। দুটি করে জমা পড়েছে ১৩টিতে (২৮.৮৮ শতাংশ), আর তিনটি করে জমা পড়েছে দুটিতে (৪.৪৪ শতাংশ)। অথচ দেশে ছাপাখানা আছে এক হাজারেরও বেশি।
পাঠ্যপুস্তক ছাপার প্রাক্কলিত দর ফাঁস, সমঝোতায় কাজ ভাগ-বাটোয়ারা, অতিরিক্ত ব্যয় ২৫২ কোটি টাকা
১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
২০১০ সালে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করে বিকাশের ডিস্ট্রিবিউশন ফ্র্যাঞ্চাইজি নেন জাহাঙ্গীর আলম নামে এক মুদ্রণ ব্যবসায়ী। তবে এর আড়ালে তিনি বহু সন্দেহজনক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালান। কোম্পানির নামে থাকা একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা জমা হয়, যার বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি এবং যা ব্যবসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে কোম্পানিটি ও জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতিষ্ঠার চার বছর পর জাহাঙ্গীরের ব্যাবসায়িক পার্টনার হন সব সরকারের আমলে ক্ষমতাধর একটি ছাপাখানার মালিক।
জাহাঙ্গীর বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন। তখন কোম্পানিটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পাঠ্যবই ছাপার কাজ করে আসা ওই ছাপাখানার মালিকের হাতে। পরিস্থিতি অনুকূলে নয় বুঝতে পেরে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ থেকে সবকিছু গুটিয়ে নেন তিনি।
পড়ুন: পাঠ্যপুস্তক ছাপার প্রাক্কলিত দর ফাঁস, সমঝোতায় কাজ ভাগ-বাটোয়ারা, অতিরিক্ত ব্যয় ২৫২ কোটি টাকা
সরকারকে বেকায়দায় ফেলার দাবি
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দরপত্র লাইভে থাকা অবস্থায় প্রাক্কলিত দর বাড়ানো বা কমানোর সুযোগ নেই। কারণ বাজার যাচাই করে প্রাক্কলন কমিটি দর তৈরি করেছে এবং হোপের অনুমোদনও নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমত, দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পর কোনো দরদাতা পাওয়া না গেলে নতুন করে দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরি করিয়ে পুনরায় দরপত্র দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দরদাতারা প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি দর প্রস্তাব করলে বাজেট পাওয়া সাপেক্ষে আবার বাজার যাচাই করে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দরে কার্যাদেশ দেওয়া যায়। কিন্তু এই দুই প্রক্রিয়ার কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫-এর লঙ্ঘন।
পিপিআরের বিধি ৪৪(২)-এ বলা হয়েছে, ‘সকল দরপত্র, প্রস্তাব বা কোটেশন বাতিল করা যাইবে, যদি-(ক) দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয় বাস্তবসম্মত হওয়া সত্ত্বেও সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দরপত্র বা কোটেশন উক্ত প্রাক্কলিত ব্যয় অপেক্ষা অধিক হয়; বা (খ) ক্রয় প্রক্রিয়ায় কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় (যথা-সম্ভাব্য কতিপয় দরপত্রদাতা কর্তৃক অংশগ্রহণ না করা)।’
প্রেস মালিকদের ডেকে এনে ব্যাকডেটে স্বাক্ষর
দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় গত মঙ্গলবার এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুদক। তারা দরপত্রের বেশ কিছু কাগজপত্র নিয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে গত বুধবার অনানুষ্ঠানিকভাবে অধিকাংশ প্রেস মালিককে ডেকে আনে এনসিটিবি। প্রথম পর্যায়ের প্রাক্কলিত দর বাজার উপযোগী ছিল না, এ কথা প্যাডে ব্যাকডেটে লিখে দিতে হয় তাদের।
বিষয়টির সত্যতা জানতে গতকাল রাতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফখরুল মাওলাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। অন্য কর্মকর্তারা ফোন ধরলেও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে একাধিক সিডিউল বিক্রি হয়েছে। যেমন প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৪১ নম্বর লটে ২৪টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি। ৩৫৯ নম্বর লটে ২২টি বিক্রি হলেও জমা পড়েছে দুটি, আর ৩৮৮ নম্বর লটে ১৭টি বিক্রির বিপরীতে জমা পড়েছে একটি। ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৫২ নম্বর লটে ১৯টি দরপত্র বিক্রি হলেও জমা পড়েছে একটি, ৬২১ নম্বর লটে ১৮টির মধ্যে একটি এবং ৬৩৪ নম্বর লটে ১৭টির মধ্যে মাত্র একটি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর পড়েছে ৩.৩২ টাকা, আর প্রাথমিকে ৩.৫৪ টাকা। অথচ ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণে কোনো একক দরপত্র জমা পড়েনি।
সে বছর মাধ্যমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২.৩১ টাকা এবং প্রাথমিকে ৩.৪৪ টাকা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজে বই ছাপা হচ্ছে। সেই হিসাবে দরপত্র লাইভে থাকা অবস্থায় দর পরিবর্তন করে ২৫২ কোটি টাকার বেশি গায়েব করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে প্রতি ফর্মার প্রাক্কলিত দর ৩.১৭ টাকা হলেও প্রতিযোগিতামূলক দরে গড়ে ২.৩১ টাকায় কাজ করেছেন প্রেস মালিকরা।
এর অন্যতম কারণ, এনসিটিবির প্রাক্কলিত দর তারা জানতে পারেননি এবং নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেটও করতে পারেননি। এ ছাড়া গত বছর প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে জমা পড়েছে ১০ থেকে ২৫টি দরপত্র।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘দরপত্রে লাইভে চলে আসার পর নতুন করে দরপত্র প্রাক্কলনের কোনো সুযোগ নেই। এটা আইন-বহির্ভূত কাজ। অথচ সেই কাজটি করেছে এনসিটিবি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সব জেনেশুনে চুপ ছিল কেন—সেটি আমার বোধগম্য নয়। আমরা এই অনিয়মের প্রতিকার চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুদক এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়েছে। তারা তদন্ত করলেই আসল সত্যটা বেরিয়ে আসবে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা বছরের প্রথম দিন যেন ভালো মানের বই পায়। সরকারকেও এই মহৎ কাজে যেন অতিরিক্ত টাকা গচ্চা দিতে না হয়।’
