শেখ রিয়াদ মুহাম্মদ নুর
বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার ও অপপ্রচার দীর্ঘদিন ধরে চালানো হচ্ছে যে তিনি নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। এই আজগুবি অভিযোগ কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্র ছাড়াই ২০০০ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে লিখিতভাবে হাজির করেছিলেন এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এম এ মতিন। তাঁর দাবি ছিল, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আয়োজিত একটি সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন। অথচ ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণে স্পষ্ট, ওই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ছিলেন না; তিনি অসুস্থ অবস্থায় শিলাইদহে ছিলেন। আজ পর্যন্ত কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততার কোনো গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।
আসলে এখানে রবীন্দ্রনাথ কোনো বিষয়ই নন; বিষয়টি হলো বাংলাদেশের একশ্রেণির সাম্প্রদায়িক মানুষের নোংরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। বিশেষ করে জামায়াত-শিবির ও মুসলিম লীগীয় আদর্শে বিশ্বাসী একশ্রেণির মানুষ রবীন্দ্রনাথকে টার্গেট করে মূলত হিন্দুবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফায়দা লুটতে চায়।
অথচ মজার বিষয় হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে তৎকালীন তিনজন বিখ্যাত মুসলমানও ছিলেন—ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, প্রখ্যাত সাংবাদিক মাওলানা আকরাম খাঁ এবং বদরুদ্দীন উমরের দাদা মাওলানা আবুল কাসেম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের ১৪৩ পৃষ্ঠায় তাঁদের নাম উল্লেখ রয়েছে, যার সূত্র হিসেবে ১৯১২ সালের ৩১ মার্চের ঢাকা প্রকাশ পত্রিকার উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারকারীদের মুখে এই মুসলমানদের নাম শোনা যায় না! কারণ তাঁদের উদ্দেশ্য ইতিহাসের সত্য উদ্ঘাটন নয়, রবীন্দ্রনাথকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো।
অথচ যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন, তৎকালীন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তাঁদের নিজস্ব যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি বরং তাঁদের বিরোধিতার পক্ষেই মত দিই। বিশেষ করে মাওলানা আকরাম খাঁর সেই যুক্তি, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বিস্তারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছিল, সেটিকে আমি সমর্থন করি।
কারণ আমার বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে শিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি মুসলিম লীগীয় রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যও ছিল। আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সুতরাং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, এখানকার তথাকথিত শিক্ষিতদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব এবং কী ধরনের মূর্খের দল ডিগ্রি নিয়ে বের হয়, সে সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ত্রিশ হাজার মানুষের মধ্যে দু-চারজন ভালো বের হলে সেটি কোনো প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উৎকর্ষের প্রমাণ নয়, সেটি ব্যতিক্রমমাত্র। এমন শিক্ষাব্যবস্থায় নির্বিচারে ডিগ্রি বিলি করার চেয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করাই অনেক বেশি জরুরি ছিল।
তবে আমার মূল বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে নয়; আমার প্রশ্ন হলো, যেসব বিখ্যাত মুসলমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের নাম আড়াল করে কেন এমন একজন রবীন্দ্রনাথকে বিরোধিতাকারী বানানো হয়, যাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণই নেই?
এর উত্তর একটাই—সাম্প্রদায়িক ভণ্ডামি, ইতিহাস বিকৃতি এবং রাজনৈতিক অসততা। বাংলাদেশের সমাজে ইতিহাস না পড়ে, দলিল না দেখে, ধর্মীয় বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রচার করার যে প্রবণতা, এই ঘটনা তারই একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, এই মিথ্যাচার যাচাই করার ন্যূনতম বুদ্ধিবৃত্তিক সততাও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের নেই।
