অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
পাঁচই আগস্টের পর বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক অদ্ভুত বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতা আবিষ্কার করছি। কোথাও গণবিবাহের প্রস্তাব, কোথাও গরুর মাংস রান্না নিয়ে সংঘাত, কোথাও পশু জবাই নিষিদ্ধ করে প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি, আবার সেই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গরু নিয়ে মিছিল!
ভাবছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রাধিকার আসলে কোথায়?
গণবিবাহ কিংবা গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। একজন নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে জানি, খাদ্য কখনোই কেবল খাদ্য নয়। এর সঙ্গে সংস্কৃতি, ধর্ম, পরিচয়, ক্ষমতা এবং সামাজিক সম্পর্কের গভীর যোগ রয়েছে। ফলে খাদ্যকে কেন্দ্র করে সংঘাতও তুচ্ছ নয়; বরং এসব সংঘাতের মধ্য দিয়েই একটি সমাজের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক উন্মোচিত হয়।
তবে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর মাংস রান্না ও খাওয়ার স্বাধীনতা যদি আমরা সমর্থন করি, তাহলে অন্য কোনো শিক্ষার্থী আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ বিধি মেনে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন করতে চাইলে আমরা কি একই স্বাধীনতা স্বীকার করব?
যাঁরা আজ খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার, তাঁরা কি সেদিনও একই অবস্থানে দাঁড়াবেন?
নিজের পছন্দের স্বাধীনতাকে সমর্থন করা উদারতা নয়। প্রকৃত উদারতার পরীক্ষা শুরু হয় তখনই, যখন অন্যের স্বাধীনতা আমার বিশ্বাস, রুচি কিংবা সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না। অবশ্যই স্বাধীনতা মানে সীমাহীন অধিকার নয়। অন্যের উপাসনাস্থলের মর্যাদা, ধর্মীয় অনুভূতি, জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার দায় সবার। কিন্তু সেই দায় ও নিয়ম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘু—সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় তো এমন একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা, যেখানে একজন ধার্মিক, একজন নাস্তিক, একজন রক্ষণশীল কিংবা একজন প্রগতিশীল সমান মর্যাদায় সহাবস্থান করবেন। কেউ কারও বিশ্বাস গ্রহণ করতে বাধ্য নন; কিন্তু প্রত্যেকের সমান অধিকার স্বীকার করার নৈতিক দায় রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ সবাইকে একভাবে চিন্তা করতে শেখানো নয়; ভিন্নভাবে চিন্তা করেও কীভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে হয়, সেটি শেখানো। অথচ আমাদের অনেক বিতর্কে যুক্তির চেয়ে পরিচয়, সহনশীলতার চেয়ে আধিপত্য এবং নীতির চেয়ে গোষ্ঠীগত আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। আমরা বৈষম্যহীনতার কথা বলি, কিন্তু নিজেদের বিশ্বাসের বাইরে অন্যের সমান অধিকার স্বীকার করতে দ্বিধা করি।
এদিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে গবেষণার অর্থায়ন, একাডেমিক স্বাধীনতা, শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের আবাসন, শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার মতো মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। QS World University Rankings 2026-এ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ৬০০তম। র্যাঙ্কিং অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষের একমাত্র মানদণ্ড নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্ঞান উৎপাদনে আমাদের অবস্থান নিয়ে আত্মসমালোচনার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
সেখানে বিয়ের আয়োজন কিংবা গরু জবাইয়ের অনুমতিকে কেন্দ্র করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন আমাদের অগ্রাধিকার ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক।
ভাই, গরু জবাই আর গণবিবাহের আয়োজন করে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং বাড়ত, তাহলে আমাদের এত দিনে বিশ্বসেরা দশে থাকার কথা! তবে সংকট কেবল র্যাঙ্কিংয়ের নয়। সংকট আরও গভীরে—আমরা কি এমন এক শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা নিজেদের অধিকার দাবি করতে জানে, কিন্তু অন্যের সমান অধিকার স্বীকার করতে শেখেনি?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি জ্ঞানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে পারে; কিন্তু তা মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তিবাদী, সহনশীল কিংবা ন্যায়পরায়ণ করে তোলে না।
পাঁচই আগস্টের পর আমরা নতুন বাংলাদেশ, বৈষম্যহীন সমাজ এবং মুক্তচিন্তার কথা বলেছি। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন আর চিন্তার সংস্কৃতির পরিবর্তন এক বিষয় নয়। পুরোনো অসহিষ্ণুতার জায়গায় নতুন অসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি নয়। আধিপত্যকারীর পরিচয় বদলালেই আধিপত্যের কাঠামো বদলে যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চা, প্রশ্ন, বিতর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা; সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা কিংবা সংখ্যালঘুর পরিচয়কে প্রান্তিক করার প্রতিষ্ঠান নয়। মতভিন্নতা সেখানে সংকট নয়, জ্ঞান উৎপাদনের অপরিহার্য শর্ত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গরু, শূকর কিংবা বিয়ের নয়। প্রশ্নটি আমাদের নৈতিক সততা, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতা এবং স্বাধীনতার ধারণা নিয়ে।
আমরা কি সত্যিই বৈষম্যহীন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, নাকি কেবল বৈষম্য করার ক্ষমতাটি নিজেদের হাতে চাই?
বিভ্রম -৪
অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
১৬ অক্টোবর, ২০২৬
