বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের জাতীয় সত্তার সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও স্পর্শকাতর অধ্যায়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হীনস্বার্থে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। সম্প্রতি সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে জিয়াউর রহমানকে ২৭ শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় “অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক” হিসেবে উল্লেখ করার যে তথ্য বিতর্ক তৈরি করেছে, তা কেবল একটি সাধারণ ভুল নয়—বরং দেশের মহান স্বাধীনতা দিবস এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক গভীর অপপ্রয়াস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের কালপঞ্জি ও আন্তর্জাতিক দলিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু করে, ঠিক তখনই ২৫শে মার্চ মধ্যরাতের পর (অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেস ও গোপন বার্তার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদান করেন। তৎকালীন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং ভয়েস অব আমেরিকা ২৬শে মার্চেই এই ঘোষণার সংবাদ বিশ্বজুড়ে প্রচার করে। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আড়াল করে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭শে মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঘটনাকে যদি মূল সূচক হিসেবে দেখানো হয়, তবে তা দেশের স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তিকেই সরাসরি আঘাত করে।
পাঠ্যপুস্তকের ভুল তথ্যানুযায়ী জিয়াউর রহমান যদি ২৭শে মার্চ “অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি” ও “লিবারেশন আর্মির সর্বাধিনায়ক” হয়ে থাকেন, তবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে তা সরাসরি সাংঘর্ষিক। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত এবং ১৭ই এপ্রিল শপথ নেওয়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার (মুজিবনগর সরকার)-এর রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
অপরদিকে, মুক্তিযুদ্ধে গঠিত বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী। মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের (পরবর্তী সময়ে ‘জেড’ ফোর্স) সেক্টর কমান্ডার। তিনি সহ অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তারা মুজিবনগর সরকারের অধীনে সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে চারশত বা পাঁচশত টাকা ভাতা গ্রহণ করে দায়িত্ব পালন করেছেন। যদি তিনি নিজেই রাষ্ট্রের স্বঘোষিত প্রধান বা সর্বাধিনায়ক হতেন, তবে মুজিবনগর সরকারের নির্দেশনায় নির্দিষ্ট বেতনে যুদ্ধ পরিচালনা করার কোনো প্রশাসনিক বা যৌক্তিক ভিত্তি থাকত না।
একাত্তরের ২৫শে মার্চের কালরাতে পশতু ও পাঞ্জাবি বাহিনীর নরসংহারের পেছনে কেবল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পাশবিকতাই ছিল না, এর পেছনে ছিল এ দেশীয় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ দেশবিরোধী ভূমিকা। একাত্তরে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী অঙ্গসংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনকে ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে হানাদারদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সময় থেকে শুরু করে পুরো মুক্তিযুদ্ধকালজুড়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব ও তাদের গঠিত আধাসামরিক বাহিনী (শান্তি কমিটি, আলবদর, আলশামস) দেশের মুক্তিকামী মানুষ, বুদ্ধিজীবী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নারকীয় হত্যা, লুণ্ঠন ও নির্যাতনের পথ সুগম করেছিল।
রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য পাঠ্যপুস্তকে এ ধরনের ভুল তথ্য সংযোজন কোনো একক ব্যক্তির পদবি পর্যালোচনার বিষয় নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা এবং স্বাধীনতা দিবসের বৈশ্বিক ও আইনি স্বীকৃতিকে ধ্বংস করার এক নগ্ন চেষ্টা। একাত্তরের কালরাত্রি, লাখো শহীদের রক্ত, মুজিবনগর সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক অবদান এবং স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর ঘাতক ভূমিকা ভুলে গেলে চলবে না। নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্তিমুক্ত রাখা এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর ও সার্বভৌম জাতি গঠন করাই আজ গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব।
