জাকির হেসেন
আনুষ্ঠানিকভাবে জমিদারি পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে পূর্ববঙ্গে আসেন ১৮৮৯ সালের নভেম্বর মাসে, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৮ বছর (২৮ বছর ৬ মাস)। এর পূর্বে কিশোর ও তরুণ বয়সে (১৮৭৭ ও ১৮৮০-এর দশকে) তিনি পারিবারিক সূত্রে স্বল্প সময়ের জন্য পদ্মা অঞ্চলে নৌভ্রমণে এসেছিলেন, কিন্তু প্রত্যক্ষ কাজের জন্য তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আগমন ঘটে ১৮৮৯ সালের শেষভাগে।
তিনি পূর্ববঙ্গে (প্রধানত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁর পতিসরে) সপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাস ও নিবিড় জমিদারি পরিচালনা করেন ১৮৮৯ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর (এক যুগ)। পরবর্তীকালে ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও তাঁর এই উপস্থিতি থেমে যায়নি; ১৯০১ থেকে ১৯২০-২১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতি বছর নিয়মিত বিরতিতে পূর্ববঙ্গে আসতেন এবং তাঁর গৃহীত পল্লি পুনর্গঠনের কাজ পরিচালনা করতেন। ১৯২১ সালে তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথের হাতে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দেন এবং শেষবারের মতো ১৯৩৭ সালে পতিসরে পদার্পণ করেন। ফলে ভৌগোলিক ও আত্মিক সম্পর্কের দিক থেকে তিনি পূর্ববঙ্গের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন প্রায় ৩২ বছর (১৮৮৯–১৯২১)।
পূর্ববঙ্গের মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তির রূপরেখা ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহ
রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গে কেবল একজন রাজস্ব আদায়কারী জমিদার হিসেবে থাকেননি; তিনি এখানকার সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, মহাজনী ঋণের নাগপাশ, রোগ-ব্যাধি ও অশিক্ষা প্রত্যক্ষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করে তোলার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তির (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার ও অর্থনীতি) লক্ষ্যে তিনি একক প্রচেষ্টায় বহুবিধ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন:
১. পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫): মহাজনী চড়া সুদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে আধুনিক সমবায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান।
২. হিতৈষী সভা (১৯১৫): কালীগ্রামের তিনটি বিভাগে (পতিসর, কামতা, রাতোয়াল) প্রজাদের স্বশাসনের জন্য গঠিত পরিচালনা পরিষদ।
৩. কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন / হাইস্কুল (পতিসর, ১৯১৩): প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক সন্তানদের আধুনিক মাধ্যমিক শিক্ষার বিদ্যাপীঠ।
৪. পতিসর মিডল ইংলিশ (এম. ই.) স্কুল (১৯০৫): প্রাথমিকোত্তর স্তর পার হওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়।
৫. শিলাইদহ এম. ই. স্কুল ও পাঠশালা (১৮৯২): নদীতীরবর্তী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যায়তন।
৬. মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয় (পতিসর ও শিলাইদহ, ১৮৯৩-১৯০৫): বিনামূল্যে সার্বজনীন চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণের প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র।
৭. ধর্মগোলা বা শস্য ব্যাংক নেটওয়ার্ক (১৮৯৬-১৯০৭): আপৎকালে খাদ্য নিরাপত্তা ও বীজ সংরক্ষণের জন্য সমবায় শস্যাগার।
৮. গ্রাম্য পঞ্চায়েত ও সালিশি সভা (আদালত): আদালতের খরচ ও পুলিশের হয়রানি ছাড়াই গ্রাম্য বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য লোকআদালত।
৯. বয়ন বিদ্যালয় ও তাঁত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (শিলাইদহ ও পতিসর): ফ্লাই-শাটল তাঁত শিখিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
১০. নমুনা কৃষি প্রদর্শনী খামার (শিলাইদহ, ১৮৯৮): আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের প্রয়োগ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঠপর্যায়ের প্রতিষ্ঠান।
১১. সমবায় ভাণ্ডার ও সমবায় বিপণন সমিতি (১৯০৫): মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রুখতে কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বাজারজাতকরণের কাঠামো।
১২. কুটির শিল্প ইউনিট (মৃৎশিল্প ও ছাতা তৈরির কারখানা, পতিসর): খড়ের ঘরের আগুন প্রতিরোধে টালি তৈরি ও বিকল্প জীবিকার কারখানা।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গ, বর্তমান বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের অবদান:
নিম্নে গবেষক অমিতাভ চৌধুরী (জমিদার রবীন্দ্রনাথ), শচীন্দ্রনাথ অধিকারী (পল্লী পুনর্গঠনে রবীন্দ্রনাথ), প্রশান্তকুমার পাল (রবিজীবনী), আহমদ রফিক (রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর), ড. আতিউর রহমান এবং রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণ ও নথিপত্রের ভিত্তিতে ৪২টি সুনির্দিষ্ট অবদান সময়কাল, পেছনের কারণ ও বিবরণসহ তুলে ধরা হলো:
১. আধুনিক কৃষি ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর
– ১. লোহার উন্নত লাঙল ও আধুনিক কৃষিযন্ত্র প্রবর্তন
– সময়কাল: ১৮৯৫–১৯০৫
– পেছনের কারণ: প্রাচীন আমলের কাঠের হালকা লাঙল মাটির গভীরে প্রবেশ করত না, ফলে ভূমির আর্দ্রতা ধরে রাখা যেত না এবং ফলন ছিল অত্যন্ত কম।
– বিবরণ: রবীন্দ্রনাথ নিজ উদ্যোগে কলকাতা থেকে ভারী লোহার তৈরি মাটি উল্টানো লাঙল আমদানি করেন এবং পরবর্তীতে পতিসরের মাঠে ৭টি আধুনিক কলের লাঙল (ট্রাক্টর) নামিয়ে যান্ত্রিক চাষের ভিত্তি গড়েন।
– রেফারেন্স: রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতৃস্মৃতি; অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ২. পুত্র ও জামাতাকে আধুনিক কৃষিবিদ্যায় উচ্চশিক্ষায় প্রেরণ
– সময়কাল: ১৯০৬
– পেছনের কারণ: রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, গ্রামীণ কৃষির পশ্চাৎপদতা দূর করতে কৃষকদের পাশে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানী থাকা জরুরি।
– বিবরণ: পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধু-পুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে আইন পড়তে না পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি ও পশুপালন বিদ্যা শিখতে পাঠান।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্রাবলি (চিঠিপত্র ১৯, পৃ. ১১১); ড. আতিউর রহমান।
– ৩. উচ্চফলনশীল ও বিকল্প ফসলের বীজ সম্প্রসারণ
– সময়কাল: ১৮৯৬–১৯১০
– পেছনের কারণ: পূর্ববঙ্গের কৃষকরা মূলত এক-ফসলি ধানের ওপর নির্ভরশীল ছিল; অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টিতে ধান নষ্ট হলে ঘরে ঘরে হাহাকার পড়ত।
– বিবরণ: মাদ্রাজ ও বোম্বাই থেকে উন্নত জাতের তুলার বীজ, আমেরিকান ভুট্টা, আলু, চীনা বাদাম এবং উন্নত পাটের বীজ এনে কৃষকদের মাঝে বিতরণ ও চাষে উদ্বুদ্ধ করেন।
– রেফারেন্স: শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, পল্লী পুনর্গঠনে রবীন্দ্রনাথ।
– ৪. নমুনা কৃষি প্রদর্শনী খামার (Experimental Farm) স্থাপন
– সময়কাল: ১৮৯৮
– পেছনের কারণ: দরিদ্র কৃষকরা কোনো নতুন প্রযুক্তি বা অজানা শস্য নিজ জমিতে সরাসরি পরীক্ষা করতে সাহস পেত না।
– বিবরণ: শিলাইদহের খোরশেদপুরে এস্টেটের নিজস্ব জমিতে আধুনিক কৃষিপরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সফল ফলন দেখিয়ে চাষীদের বিশ্বাস অর্জন করা হতো।
– রেফারেন্স: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী (১ম খণ্ড)।
– ৫. স্থানীয় মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা ও কম্পোস্ট সারের ব্যবহার
– সময়কাল: ১৯০৭–১৯১২
– পেছনের কারণ: জমিতে দীর্ঘকাল একই শস্য ফলানোর ফলে মাটির পুষ্টি উপাদান নিঃশেষিত হয়ে উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছিল।
– বিবরণ: আমেরিকা থেকে ডিগ্রি নিয়ে ফেরা রথীন্দ্রনাথকে দিয়ে মাটির রাসায়নিক গঠন পরীক্ষা করান এবং জমিতে রাসায়নিক সার ও গোবর-আবর্জনা পচিয়ে কম্পোস্ট সার ব্যবহারের পদ্ধতি শেখান।
– রেফারেন্স: রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতৃস্মৃতি।
– ৬. উন্নত জাতের গবাদিপশু আনয়ন ও ডেইরি ফার্ম গড়ে তোলা
– সময়কাল: ১৯০৭–১৯১৫
– পেছনের কারণ: স্থানীয় গরু ছিল আকারে ছোট ও কম দুধ দিত; হাল টানার মতো বলদের চরম সংকট ছিল।
– বিবরণ: হরিয়ানা, সিন্ধু ও হিসার থেকে উন্নত জাতের প্রজননক্ষম ষাঁড় ও গাভী এনে পতিসর ও শিলাইদহে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন ও যৌথ দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠা করেন।
– রেফারেন্স: প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী (৫ম খণ্ড)।
– ৭. ধান মাড়াই কল ও মেকানিক্যাল প্রক্রিয়াজাতকরণ
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১০
– পেছনের কারণ: সনাতন পদ্ধতিতে গরু দিয়ে ধান মাড়াই করতে প্রচুর সময় ও শ্রম নষ্ট হতো এবং ফসলের অপচয় ঘটত।
– বিবরণ: পতিসরে মেকানিক্যাল প্যাডেল চালিত ও ইঞ্জিন চালিত ধান মাড়াই যন্ত্র স্থাপন করেন, যা কৃষকদের বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
– রেফারেন্স: আহমদ রফিক, রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর।
– ৮. পাম্পিং মেশিনে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার পরীক্ষা
– সময়কাল: ১৮৯৯–১৯০৬
– পেছনের কারণ: খরা মৌসুমে নাগর নদী ও পদ্মার সংলগ্ন খাল শুকিয়ে গেলে কৃষিজমি ফেটে চৌচির হতো।
– বিবরণ: নদী থেকে পানি তোলার জন্য বিদেশ থেকে তেলচালিত পাম্প মেশিন ও হস্তচালিত জল উত্তোলন যন্ত্র এনে প্রদর্শনী জমিতে সেচ দেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ৯. রেশম গুটিপোকা ও তুঁত চাষের সম্প্রসারণ
– সময়কাল: ১৮৯৮–১৯০৩
– পেছনের কারণ: শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের কোনো কাজ থাকত না, ফলে মৌসুমী বেকারত্ব তীব্র হতো।
– বিবরণ: শিলাইদহের নদীপাড়ে শত শত তুঁত গাছ রোপণ করে কৃষকদের ঘরে ঘরে রেশম গুটিপোকার চাষ শিখিয়ে গৃহভিত্তিক বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করেন।
– রেফারেন্স: শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ।
২. গ্রামীণ অর্থনীতি, ঋণমুক্তি ও সমবায় ব্যবস্থা
– ১০. পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা
– সময়কাল: ১৯০৫
– পেছনের কারণ: স্থানীয় মহাজনরা কৃষকদের শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ চক্রবৃদ্ধি সুদে ঋণ দিয়ে ভিটেমাটি কেড়ে নিত এবং বংশপরম্পরায় দাস বানিয়ে রাখত।
– বিবরণ: বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে প্রাথমিক পুঁজিতে এই ব্যাংক স্থাপন করেন, যা সাধারণ কৃষককে মাত্র ৭ থেকে ১২ শতাংশ সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করত।
– রেফারেন্স: ড. আতিউর রহমান, রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় পতিসর; উইকিপিডিয়া।
– ১১. নোবেল পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ কৃষি ব্যাংকে মূলধন হিসেবে দান
– সময়কাল: ১৯১৩–১৯১৪
– পেছনের কারণ: ব্যাংকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ফলে প্রজাদের ঋণের বিপুল চাহিদা মেটাতে তীব্র মূলধন সংকট দেখা দেয়।
– বিবরণ: গীতাঞ্জলির জন্য প্রাপ্ত নোবেল পুরস্কারের ১ লাখ ৮ হাজার (মতান্তরে ১ লাখ ১৮ হাজার) টাকার সম্পূর্ণ অংশ পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে স্থানান্তর করেন।
– রেফারেন্স: প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী (৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪৬২); আহমদ রফিক।
– ১২. বইয়ের রয়্যালটি ও বক্তৃতা ফি গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিলে জমা
– সময়কাল: ১৯১৭
– পেছনের কারণ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক মন্দায় কৃষকদের দেনা বৃদ্ধি পায় এবং ব্যাংকের তারল্য সংকট দেখা দেয়।
– বিবরণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতার মাধ্যমে অর্জিত সম্মানী এবং বইয়ের রয়্যালটি থেকে প্রাপ্ত আরও ৯,০০০ টাকা ব্যাংকে জমা দেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ১৩. সমবায় বিপণন ও ফড়িয়া উচ্ছেদ ব্যবস্থা
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১২
– পেছনের কারণ: ধান, পাট ও সরিষা কাটার মৌসুমে পাইকার ও দালালরা অভাবী কৃষকদের জিম্মি করে নামমাত্র মূল্যে ফসল কিনে নিত।
– বিবরণ: সমবায় ভাণ্ডারের মাধ্যমে কৃষকের ফসল গুদামে রেখে উপযুক্ত সময়ে বড় মোকামে বিক্রির ব্যবস্থা করেন, যাতে কৃষক সরাসরি সর্বোচ্চ লভ্যাংশ পায়।
– রেফারেন্স: সনৎকুমার সাহা, রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি ভাবনা।
– ১৪. মহাজনী ঋণ সালিশি ও কৃষকদের জমি পুনঃউদ্ধার
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১৫
– পেছনের কারণ: জাল খত ও দলিলের মারপ্যাঁচে প্রজাদের বহু জমি স্থানীয় মহাজনদের দখলে চলে গিয়েছিল।
– বিবরণ: কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে মহাজনদের বকেয়া এককালীন পরিশোধ করে কৃষকদের দায়মুক্ত করেন এবং মহাজনদের দ্বারা বেদখল হওয়া জমি কৃষকদের কাছে ফেরত দেন।
– রেফারেন্স: আহমদ রফিক, রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর।
– ১৫. ধর্মগোলা (Grain Bank) নেটওয়ার্ক স্থাপন
– সময়কাল: ১৮৯৬–১৯০৭
– পেছনের কারণ: বন্যায় ফসল ডুবে গেলে বা খরায় শুকিয়ে গেলে প্রান্তিক কৃষকদের না খেয়ে মরতে হতো এবং বীজের জন্য চড়া সুদে হাত পাততে হতো।
– বিবরণ: প্রতিটি প্রধান মৌজায় একটি করে পাকা ধর্মগোলা নির্মাণ করেন; ফসলের মৌসুমে কৃষকরা সেখানে ধান জমা রাখত এবং দুর্দিনে কোনো প্রকার সুদ ছাড়াই খাদ্য ও বীজধান ধার পেত।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পল্লীপ্রকৃতি; ড. আতিউর রহমান।
৩. সর্বজনীন শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার
– ১৬. পতিসর কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন (হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠা
– সময়কাল: ১৯১৩
– পেছনের কারণ: শত বর্গমাইলব্যাপী কালীগ্রাম পরগনায় মাধ্যমিক স্তরের কোনো বিদ্যালয় ছিল না; কৃষকদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা ছিল অসম্ভব।
– বিবরণ: নিজস্ব জমিতে আধুনিক হাইস্কুল ভবন প্রতিষ্ঠা করেন, যোগ্য শিক্ষক আনেন এবং সুদূর গ্রাম থেকে আসা ছাত্রদের জন্য বিনামূল্যে বোর্ডিং সুবিধা চালু করেন।
– রেফারেন্স: রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতৃস্মৃতি; দৈনিক প্রথম আলো।
– ১৭. পতিসর মিডল ইংলিশ (এম. ই.) স্কুল স্থাপন
– সময়কাল: ১৯০৫
– পেছনের কারণ: প্রাথমিক পাঠ শেষ করার পর ইংরেজি ও আধুনিক সাধারণ শিক্ষার কোনো মাধ্যম ছিল না।
– বিবরণ: মাটির দেয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে নিজেই এই বিদ্যালয়টি উদ্বোধন করেন এবং স্থানীয় দরিদ্র ছাত্রদের বেতন সম্পূর্ণ মওকুফ করেন।
– রেফারেন্স: ড. আতিউর রহমান, দৈনিক সমকাল।
– ১৮. শিলাইদহ এম. ই. স্কুল ও অবৈতনিক পাঠশালা স্থাপন
– সময়কাল: ১৮৯২–১৮৯৮
– পেছনের কারণ: নদীপাড়ের গ্রামীণ কৃষক-জেলেদের সন্তানদের অক্ষরজ্ঞান ছিল শূন্যের কোঠায়।
– বিবরণ: শিলাইদহে পাঠশালা ও মিডল ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং হিন্দু-মুসলমান সমস্ত প্রজার সন্তানদের বাধ্যতামূলক শিক্ষার নির্দেশ দেন।
– রেফারেন্স: শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ।
– ১৯. কৃষকদের জন্য সান্ধ্য ও নৈশবিদ্যালয় পরিচালনা
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১৫
– পেছনের কারণ: বয়স্ক ও কিশোর কৃষকরা সারা দিন মাঠে কাজ করায় দিনের বেলা স্কুলে যেতে পারত না।
– বিবরণ: গ্রামের কাছারি ও পাঠশালা প্রাঙ্গণে রাতের বেলা প্রদীপ জ্বালিয়ে কৃষকদের সাধারণ হিসাব-নিকাশ, নাম দস্তখত ও বই পড়া শেখানোর নৈশবিদ্যালয় চালু করেন।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্র রচনাবলী, ১০ম খণ্ড; আহমদ রফিক।
– ২০. মেধা ও দরিদ্রভিত্তিক শিক্ষাবৃত্তি তহবিল গঠন
– সময়কাল: ১৮৯৬–১৯২০
– পেছনের কারণ: দারিদ্র্যের কারণে বহু প্রতিভাবান গ্রামীণ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত।
– বিবরণ: জমিদারির বার্ষিক আয়ের একটি অংশ নির্দিষ্ট রেখে স্থানীয় বহু মুসলিম ও অনুন্নত হিন্দু শিক্ষার্থীর জেলা শহর ও কলকাতায় উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ২১. কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি
– সময়কাল: ১৯০৮–১৯১৫
– পেছনের কারণ: শুধু পুঁথিগত কেরানি-তৈরি শিক্ষা গ্রামের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হতে পারে না।
– বিবরণ: বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কাঠমিস্ত্রির কাজ, তাঁত বোনা, চামড়ার কাজ ও হিসাব সংরক্ষণের বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক ক্লাস চালু করেন।
– রেফারেন্স: প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী।
– ২২. গ্রামীণ ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ও সংবাদপত্র পড়ার ব্যবস্থা
– সময়কাল: ১৮৯৮–১৯০৫
– পেছনের কারণ: গ্রামের সাধারণ মানুষকে বাইরের দুনিয়ার বিজ্ঞান ও রাজনীতির গতিপ্রকৃতি জানানো।
– বিবরণ: কাচারিঘরে পত্রিকা ও বই এনে রাখা হতো এবং শিক্ষকরা প্রজাদের সামনে সমসাময়িক খবরাখবর পড়ে শোনাতেন।
– রেফারেন্স: শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, পল্লী পুনর্গঠনে রবীন্দ্রনাথ।
৪. স্বাস্থ্যসেবা, মহামারি প্রতিরোধ ও বিশুদ্ধ পানীয় জল
– ২৩. মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন (পতিসর ও শিলাইদহ)
– সময়কাল: ১৮৯৩–১৯০৫
– পেছনের কারণ: চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে সাধারণ রোগেও বহু প্রজা কবিরাজি ঝাড়ফুঁক বা অপচিকিৎসায় মারা যেত।
– বিবরণ: শিলাইদহ ও পতিসরে দুটি সার্বক্ষণিক দাতব্য চিকিৎসালয় খুলে বেতনভুক্ত ডাক্তার ও কম্পাউন্ডার নিয়োগ দেন এবং বিনামূল্যে ব্যবস্থা দেন।
– রেফারেন্স: ড. আতিউর রহমান; আহমদ রফিক।
– ২৪. রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা
– সময়কাল: ১৮৯০–১৯০০
– পেছনের কারণ: ডাক্তারদের পক্ষে প্রত্যন্ত চর বা দুর্গম গ্রামে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব ছিল না।
– বিবরণ: রবীন্দ্রনাথ নিজে দেশ-বিদেশের বই পড়ে হোমিওপ্যাথি আয়ত্ত করেন এবং নৌকায় বাক্সভর্তি ওষুধ নিয়ে চর অঞ্চলের সাধারণ কৃষকদের কুঁড়েঘরে গিয়ে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতেন।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্রাবলী; শচীন্দ্রনাথ অধিকারী।
– ২৫. কলেরা ও গুটিবসন্তের প্রতিরোধক টিকাদান কর্মসূচি
– সময়কাল: ১৮৯৬–১৯০৪
– পেছনের কারণ: কুসংস্কারের কারণে প্রজারা কলেরাকে দেবী ওলাওঠার কোপ মনে করত এবং বসন্তের টিকা নিতে ভয় পেত।
– বিবরণ: কলকাতা থেকে আধুনিক ভ্যাকসিন আনিয়ে এস্টেটের কর্মীদের দ্বারা প্রজাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা তৈরি করে গণটিকাদান সম্পন্ন করেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ২৬. বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য ব্যাপক দীঘি ও ইন্দারা খনন
– সময়কাল: ১৮৯৩–১৯১০
– পেছনের কারণ: খোলা পুকুর ও দূষিত নদীর ঘোলা জল পান করার কারণে প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও বর্ষায় জলবাহিত রোগে শত শত লোক মারা যেত।
– বিবরণ: শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের বিভিন্ন গ্রামে শতাধিক ইন্দারা (কূপ) খনন করান এবং সুপেয় পানির জন্য সংরক্ষিত দীঘি প্রস্তুত করেন।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্র রচনাবলী, ১০ম খণ্ড; অমিতাভ চৌধুরী।
– ২৭. গ্রামীণ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতকরণ
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১৫
– পেছনের কারণ: বসতবাড়ির পাশে উন্মুক্ত মলমূত্র ত্যাগ ও অপরিচ্ছন্ন ড্রেনে মশা-মাছির উপদ্রবে রোগ বিস্তার ঘটত।
– বিবরণ: হিতৈষী সভার মাধ্যমে সপ্তাহে একদিন বাধ্যতামূলক গ্রাম-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং সুনির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলার নিয়ম চালু করেন।
– রেফারেন্স: আহমদ রফিক, রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর।
৫. স্বশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক সংস্কার
– ২৮. গ্রাম্য পঞ্চায়েত ও নিজস্ব সালিশি ব্যবস্থা প্রবর্তন
– সময়কাল: ১৮৯৫–১৯০৫
– পেছনের কারণ: সাধারণ বিরোধ নিয়ে ব্রিটিশ আদালতে মামলা করতে গিয়ে উকিল ও টাউটদের খপ্পরে পড়ে প্রজারা সর্বস্বান্ত হতো।
– বিবরণ: প্রতিটি গ্রামে প্রজাদের নির্বাচিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে পঞ্চায়েতি সালিশ বোর্ড গঠন করেন; ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ গ্রামে মিটিয়ে আদালতের মুখ দেখা বন্ধ করেন।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র; ড. আতিউর রহমান।
– ২৯. নায়েব-আমলাদের দুর্নীতি ও উপরি পাওনা (ঘুষ) কঠোরভাবে নিষিদ্ধকরণ
– সময়কাল: ১৮৯০–১৮৯৫
– পেছনের কারণ: জমিদারির কর্মচারীরা নিরীহ কৃষকদের কাছ থেকে নজরানা, পরব ও সেলামির নামে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করত।
– বিবরণ: দায়িত্ব নিয়েই নির্দেশ জারি করেন যে কোনো কর্মচারী উপরি পাওনা নিলে তাত্ক্ষণিক বরখাস্ত হবেন; বহু দুর্নীতিবাজ নায়েবকে তিনি সরাসরি বরখাস্ত করেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ৩০. হিতৈষী সভা গঠন ও বিকেন্দ্রীভূত স্বশাসন
– সময়কাল: ১৯১৫
– পেছনের কারণ: প্রজাদের নিজেদের শাসনভার নিজেদের হাতে ছেড়ে না দিলে তাদের আত্মশক্তি ও স্বাবলম্বিতা জাগ্রত হবে না।
– বিবরণ: কালীগ্রামের তিনটি কেন্দ্রে স্থানীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে হিতৈষী সভা গঠন করে তাদের হাতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রাস্তাঘাটের সিদ্ধান্ত ও ব্যয়ের ক্ষমতা অর্পণ করেন।
– রেফারেন্স: আহমদ রফিক, রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পল্লীপ্রকৃতি।
– ৩১. প্রজাহিতৈষী যৌথ তহবিল (ম্যাচিং ফান্ড) প্রবর্তন
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১৫
– পেছনের কারণ: সামন্ততান্ত্রিক দান-খয়রাতের পরিবর্তে প্রজাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী তহবিল গড়ে তোলা।
– বিবরণ: প্রজারা খাজনার ওপর প্রতি টাকায় সামান্য সেস (৩ পয়সা বা ১ আনা) জমা করত, আর রবীন্দ্রনাথ সমপরিমাণ অর্থ জমিদারির পক্ষ থেকে তাতে যুক্ত করে প্রজাদের উন্নয়ন তহবিলে রূপান্তর করতেন।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পল্লীপ্রকৃতি (পৃ. ২৬১)।
– ৩২. বেগার খাটা প্রথা উচ্ছেদ
– সময়কাল: ১৮৯১
– পেছনের কারণ: তৎকালীন জমিদারি প্রথায় প্রজাদের দিয়ে কাচারিতে বা জমিদারের ব্যক্তিগত কাজে বিনামূল্যে বেগার খাটানো হতো।
– বিবরণ: রবীন্দ্রনাথ তাঁর এস্টেটে বেগার খাটা সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করেন এবং প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট মজুরি পরিশোধের আইন জারি করেন।
– রেফারেন্স: শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, পল্লী পুনর্গঠনে রবীন্দ্রনাথ।
– ৩৩. হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিতকরণ
– সময়কাল: ১৮৯০–১৯১৫
– পেছনের কারণ: তৎকালীন উচ্চবর্ণের হিন্দু নায়েব-মহাজনরা মুসলিম প্রজাদের সাথে অবমাননাকর সামাজিক বৈষম্য করত (যেমন কাচারিতে মাদুর বা চেয়ারে বসতে না দেওয়া)।
– বিবরণ: কাচারিতে মুসলিম ও নিম্নবর্ণের প্রজাদের সম্মানের সাথে বসার আসন নিশ্চিত করেন, মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে সহায়তা দেন এবং ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ রক্ষা করেন।
– রেফারেন্স: ভূঁইয়া ইকবাল, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ; আহমদ রফিক।
– ৩৪. খরা ও দুর্যোগে খাজনা মওকুফ ও জরুরি লঙ্গরখানা
– সময়কাল: ১৮৯৬–১৮৯৭
– পেছনের কারণ: অনাবৃষ্টি ও ফসলের বিনষ্টের কারণে প্রজারা চরম অনাহারে পড়েছিল।
– বিবরণ: কলকাতায় পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও খাজনা আদায় স্থগিত ও আংশিক মওকুফ করেন এবং জোড়াসাঁকোর তহবিল থেকে খাদ্য এনে দুর্যোগকবলিতদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেন।
– রেফারেন্স: প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী (৪র্থ খণ্ড)।
৬. কুটির শিল্প, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান
– ৩৫. ফ্লাই-শাটল (উড়ন্ত মাকু) তাঁত প্রবর্তন ও বয়ন শিক্ষা
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯০৮
– পেছনের কারণ: সনাতন তাঁতে সারাদিন খেটেও তাঁতিরা সামান্য গামছা ছাড়া কিছু বুনতে পারত না, ফলে তীব্র দারিদ্র্যে ভুগছিল।
– বিবরণ: উন্নত ফ্লাই-শাটল তাঁত এনে প্রশিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় জোলাদের শাড়ি, চাদর ও ধুতি বোনা শেখান; ফলে তাদের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
– রেফারেন্স: রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতৃস্মৃতি।
– ৩৬. মাটির টালির কারখানা স্থাপন
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯১০
– পেছনের কারণ: খড়ের তৈরি চাল হওয়ার কারণে গ্রামে সামান্য অসাবধানতায় প্রতি বছর আগুনে পুড়ে কৃষকের সমস্ত ঘর ভস্মীভূত হতো।
– বিবরণ: কুমোরদের উন্নত ছাঁচ ও পোড়ানোর প্রযুক্তি দিয়ে টালির কারখানা গড়ে তোলেন, যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ঘরগুলো আগুন-প্রতিরোধী করা যায়।
– রেফারেন্স: আহমদ রফিক, রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর।
– ৩৭. দেশীয় ছাতা তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা
– সময়কাল: ১৯০৬–১৯১১
– পেছনের কারণ: চড়া রোদে ও বর্ষায় কাজ করা কৃষকদের বাইরে থেকে চড়া মূল্যে ছাতা কিনতে হতো।
– বিবরণ: স্থানীয় বাঁশ, বেত ও বস্ত্র ব্যবহার করে কুটির শিল্পের আদলে ছাতা তৈরির প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ৩৮. সরিষার ঘানি ও সমবায় তৈল নিষ্কাশন
– সময়কাল: ১৯০৫–১৯০৯
– পেছনের কারণ: কৃষকের উৎপাদিত সরিষা বাইরের মিল মালিকরা নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়ে ভেজাল তেল বিক্রি করত।
– বিবরণ: সমবায় ভিত্তিতে একাধিক উন্নত ঘানি স্থাপন করে কৃষকদের খাঁটি সরিষার তেল উৎপাদন ও অতিরিক্ত আয়ের পথ দেখান।
– রেফারেন্স: সনৎকুমার সাহা, রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি ভাবনা।
– ৩৯. গ্রামীণ সড়ক, সংযোগ সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ
– সময়কাল: ১৮৯৪–১৯০৮
– পেছনের কারণ: বর্ষাকালে কাদার জন্য গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হতো, রোগী বা কৃষিপণ্য হাটে নেওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না।
– বিবরণ: প্রজাদের সাথে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম ও যৌথ তহবিলে শিলাইদহ ও পতিসরে শত শত কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও কাঠের/পাকা কালভার্ট তৈরি করেন।
– রেফারেন্স: শচীন্দ্রনাথ অধিকারী, পল্লী পুনর্গঠনে রবীন্দ্রনাথ।
– ৪০. নৌপথ ড্রেজিং ও খাল সংস্কার
– সময়কাল: ১৮৯২–১৯০৫
– পেছনের কারণ: পলি পড়ে ভেতরের খালগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বর্ষা ছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহনের নৌচলাচল ব্যাহত হতো।
– বিবরণ: নিজ ব্যয়ে শ্রমিক লাগিয়ে স্থানীয় সংযোগ খালগুলোর পলি কেটে নাব্য বজায় রাখেন এবং বর্ষার পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ নিশ্চিত করেন।
– রেফারেন্স: অমিতাভ চৌধুরী, জমিদার রবীন্দ্রনাথ।
– ৪১. পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক বনায়ন
– সময়কাল: ১৮৯৬–১৯১২
– পেছনের কারণ: পদ্মার ভাঙন, জ্বালানি কাঠের সংকট এবং গ্রীষ্মের দাবদাহে ছায়ার অভাব।
– বিবরণ: রাস্তার দুপাশে ও পতিত ভিটাতে আম, জাম, নিম, কড়ই ও তুঁত গাছ লাগানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং বৃক্ষছেদন নিষিদ্ধ করেন।
– রেফারেন্স: প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী (৪র্থ খণ্ড)।
– ৪২. লোকসংস্কৃতি সংগ্রহ ও প্রান্তিক সংস্কৃতির মূল্যায়ন
– সময়কাল: ১৮৯০–১৯০১
– পেছনের কারণ: বাউল গান, লোকগীতির মতো মূল্যবান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অবহেলিত ও বিলুপ্ত হতে চলেছিল।
– বিবরণ: কুষ্টিয়া-শিলাইদহের গগন হরকরা, লালন সাঁইজির অনুসারীদের গান ও গ্রামীণ সাহিত্য সংগ্রহ করেন এবং বিশ্বদরবারে বাংলার পল্লীগীতি ও দর্শনকে পৌঁছে দেন।
– রেফারেন্স: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছিন্নপত্রাবলী; ড. আনিসুজ্জামান, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ।
প্রধান গবেষণা গ্রন্থ ও রেফারেন্স নির্দেশিকা
পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংস্কার ও অবদান মূল্যায়নে নিম্নোক্ত আকর গ্রন্থ ও গবেষণাসমূহ সবচেয়ে প্রামাণ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত:
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: পল্লীপ্রকৃতি (বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ), ছিন্নপত্রাবলী, স্বদেশী সমাজ, চিঠিপত্র (১৯শ খণ্ড)।
– রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর: পিতৃস্মৃতি (সাহিত্য সংসদ, কলকাতা)।
– প্রশান্তকুমার পাল: রবিজীবনী (খণ্ড ৩ থেকে ৭, আনন্দ পাবলিশার্স)।
– আহমদ রফিক: রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর এবং রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ।
– ড. আতিউর রহমান: রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় পতিসর, তত্ত্ব ও তথ্যে রবীন্দ্র পল্লি-উন্নয়ন।
– অমিতাভ চৌধুরী: জমিদার রবীন্দ্রনাথ (দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা)।
– শচীন্দ্রনাথ অধিকারী: পল্লী পুনর্গঠনে রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ।
– ড. আনিসুজ্জামান: পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য প্রবন্ধ।
– সনৎকুমার সাহা: রবীন্দ্রনাথের অর্থনীতি ভাবনা।
পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ ও পতিসরের এই মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষাই পরবর্তীকালে শ্রীনিকেতনের বিশ্বখ্যাত পল্লী পুনর্গঠন মডেল এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সমবায় ও ক্ষুদ্রঋণ কাঠামোর প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
—
তথ্য সংগ্রহ ও সম্পাদনা- জাকির হোসেন।
