“আমি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে আসব। আমি ভীত নই। আমি জানি, তারা আমাকে হত্যা করতে পারে, গ্রেপ্তার করতে পারে বা নির্যাতন করতে পারে, কিন্তু নিজের দেশে ফিরে যাওয়া আমার দায়িত্ব।” ১৯ অক্টোবর হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত সাক্ষাতকারের শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
দেশে ফেরা নিয়ে ভারত বা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গোপন সমঝোতার বিষয় অস্বীকার করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নত দেশ শুধু বাংলাদেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এমন নয়। একই সঙ্গে তা ভারতের নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর ইস্যুর সঙ্গে হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিকে যুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একান্তই তার। অজ্ঞাত স্থান থেকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারটি এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: আপনি কি (দেশে) ফেরার টাইমফ্রেম চূড়ান্ত করেছেন? আওয়ামী লীগের যেসব নেতা স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন, আপনি কি তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে ফেরার পরিকল্পনা করছেন? আপনার সংবাদ সম্মেলনে কেন বলেছেন দেশে ফিরলে আপনাকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে?
উত্তর: আমি বলেছি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরবো। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলতে দেয়া যায় না। যথাযথ সময়ে আমি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং কোন পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করবো তা জানিয়ে দেবো। আমি দেশে ফিরতে চাই। কারণ, বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমার সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ২৭৮৪ ডলার। এই অগ্রগতিকে এখন ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল শতকরা ৬.৮০ ভাগ। তা থেকে কমে এখন জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২.২২ ভাগ। ৫৪ বছরের মধ্যে প্রথমবার শিল্পখাত ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে রেকর্ড করেছে। দারিদ্র্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগ কমেছে। নতুন করে কমপক্ষে দুই কোটি মানুষ বেকার হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট আবার ফিরেছে। এটা শুধু আওয়ামী লীগের ইস্যু নয়। এটি একটি জাতীয় সংকট। যখন উন্নয়ন থেমে যায়, তখন কর্মসংস্থান হারায়। যখন আইন ভেঙে পড়ে, তখন জনগণ নিরাপত্তা হারায়। যখন উগ্রপন্থি নেটওয়ার্ক আবার সুযোগ পায়, তখন বাংলাদেশ আঞ্চলিক উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।মানচিত্র দেখুন
আওয়ামী লীগের বহু নেতা দেশের বাইরে। অন্য অনেকে বাংলাদেশের ভিতরেই আছেন। কিন্তু তারা আত্মগোপন করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কে কখন ফিরবেন তা দলীয় পরামর্শের মাধ্যমে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আমি চাই না কোনো নেতা, কোনো কর্মী বা সমর্থক অপ্রয়োজনে বিপদের মুখে পড়ুক। আমার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৬০০টি বানোয়াট মামলা হয়েছে। আমার জীবন নিয়ে হুমকি নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে আমার পরিবারকে হারিয়েছি। তারপর বাংলাদেশে ফিরে আমি সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্র এবং বার বার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছি। আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আমার পাবলিক র্যালিতে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল। সেখানে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩০০ মানুষ আহত হন। আমি বেঁচে যাই। কিন্তু আমার সহকর্মীদের অনেকে বাঁচতে পারেননি। তারপরও ওই হামলা আমাকে থামাতে পারেনি। এখন হুমকি আমাকে আমার দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। আমার নিজের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। ক্ষমতার জন্য আমি ফিরবো না। জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ফিরবো।
