কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদের ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যাংকের কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের হাতে না পৌঁছে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। এতে সুদের হার বেড়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে।
ঘন ঘন কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলাতে কেউ কেউ গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, এমনকি ঘরের চাল পর্যন্ত বিক্রি করছেন। ঋণের ভার সহ্য করতে না পেরে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার মনিরুল ইসলামের পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি এই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। এনজিওর ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে গত বছরের ১৫ই আগস্ট স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজেও আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি।
মৃত্যুর আগে একটি চিরকুটে তিনি লিখে যান, ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।’
মনিরুলের বাবার ভাষ্য, প্রতি সপ্তাহের কিস্তি দিতে না পারার চাপেই তার ছেলে এমন পরিণতির দিকে ঠেলে গিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লী ঋণ স্কিমে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তারপরও অনেক ব্যাংক সরাসরি কৃষকদের ঋণ না দিয়ে এনজিওর মাধ্যমে তা বিতরণ করছে। ফলে কম সুদের তহবিল কৃষকের কাছে পৌঁছানোর আগেই ঋণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—ব্যাংকগুলো মোট ৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংক দিয়েছে ২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক দিয়েছে ৪ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ করা কৃষিঋণের ৪২ দশমিক ৩৮ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, কৃষিঋণ বিতরণে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেক ব্যাংক এনজিওর মাধ্যমে ঋণ দেয়। এতে কৃষকেরা ঋণ পেলেও তাদের বেশি সুদ দিতে হয়।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খানও বলেন, এনজিওর মাধ্যমে ঋণ নিলে কৃষক পর্যায়ে সুদের হার ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
তবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির পরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের মতে, প্রত্যন্ত এলাকায় ঋণ পৌঁছে দিতে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার তুলনামূলক উঁচু।
তার বক্তব্য, কম সুদে তহবিল পাওয়া গেলে এনজিওগুলোও গ্রাহকদের কম সুদে ঋণ দিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষকদের ঋণ নেওয়ার খরচ কমাতে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবার পরিসর বাড়ানো জরুরি।
