আজ ৪ নভেম্বর, বাংলাদেশের সংবিধান দিবস। ১৯৭২ সালের এই দিনে গণপরিষদে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান গৃহীত হয়। এক সাগর রক্ত এবং লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র ৯ মাসের মধ্যে এবং জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থনে গঠিত গণপরিষদ মাত্র ৭ মাসের মধ্যে জাতিকে নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান উপহার দিয়ে সারা বিশ্বে এক নজীরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সাড়ে সাত কোটি মানুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর যে গভীর আস্থা রেখেছিলেন, তারই প্রতিদানে বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সামষ্টিক অর্জন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বঙ্গবন্ধু জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। আজকের ঐতিহাসিক দিনে বঙ্গবন্ধু, সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং গণপরিষদের সদস্যবর্গের প্রতি জাতির পক্ষ থেকে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারীকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বিবৃত সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বাংলাদেশের সংবিধানে লিপিবদ্ধ রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি, অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ও ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং বাংলাদেশের মানুষের সামনে এগিয়ে চলার ‘মহাসনদ’, যার মূল বাণী অলঙ্ঘনীয় এবং সংশোধনীর ঊর্ধ্বে। ফরাসী বিপ্লবের সাম্যের বাণী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণায় বিবৃত মানবাধিকার, ব্রিটেনের শত বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে উদ্ভূত গণতন্ত্র, এবং রুশ বিপ্লব থেকে উদ্ভূত সমাজতন্ত্রের মর্মবাণী, ও অর্ন্তনিহিত চেতনা লিপিবদ্ধ হয়েছে ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, বাংলাদেশ সংবিধানের মুখবন্ধ, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহে। ফলে বাংলাদেশের সংবিধানটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। বাংলাদেশের এই শাসনতন্ত্রে ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা, এবং অন্যান্য আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার আইনের যথার্থ প্রতিফলনও রয়েছে। আজকের এই মহান দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত সকল শহীদ, সম্ভ্রম হারানো মা-বোন এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুতের সংগ্রামে নিহত সকল শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
সংবিধান দিবস উপলক্ষে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যদেরকে, যাদের দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল বাংলাদেশের সংবিধানটি প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো- ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপশক্তি সংবিধানকে কবর দেওয়ার কথা বলে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, এবং বিদেশী বুদ্ধিজীবী ভাড়া করে অনির্বাচিত ও তথাকথিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। ইতোমধ্যে ঐকমত্য কমিশনের রচিত তথাকথিত জুলাই সনদ একটি ‘প্রতারণার দলিল’ বলে সাব্যস্ত হয়েছে এবং এসকল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয়েছে। জাতি এই ধরনের ঔদ্ধত্য এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা কখনও ক্ষমা করবে না।
ইদানীং লক্ষ্য করছি, পাতানো নির্বাচনে বিজয়ী সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, ও জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক আইন, ও রেওয়াজ কর্তৃক স্বীকৃত মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণিক ইতিহাসের পরিবর্তন। কিন্তু এটিও জাতি কখনও মেনে নেবে না। তাছাড়া, কোন মুক্তিযুদ্ধ, বা বিপ্লবের মূলনীতি পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করা যায় না। উপরন্তু, সাংবিধানিক আইনের মূল-কাঠোমো নীতি (বেসিক স্ট্রাকচার প্রিন্সিপল) ও বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতের রায় দ্বারা এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, সংবিধানের মূলনীতিসমূহ অলঙ্ঘনীয়, এবং সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা দিয়ে সংবিধান ও রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তন করা যায় না।
দেশ ও জাতির এ মহাসংকটময় মুহূর্তে সকলের প্রতি আহ্বান, আসুন আমরা সবাই মিলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে ভেঙ্গে পড়া গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধার করি, এবং বাংলাদেশকে নিয়ে আবার যাত্রা করি গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও অগ্রগতির পথে।
বাংলাদেশের সংবিধান দিবসে দেশবাসীর প্রতি রইল আমার প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
আঁধার কেটে ভোর হোক
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
www.albd.org
তারিখঃ ৪ নভেম্বর, ২০২৬
