শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ, সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা ও নাগরিক অংশগ্রহণের অধিকার খতিয়ে দেখার আহ্বান
বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে গ্লোবাল জাস্টিস নেটওয়ার্ক (জিজেএন)। এ বিষয়ে জাতিসংঘের একজন বিশেষ প্রতিবেদকসহ চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে আবেদন ও যোগাযোগ করেছে সংগঠনটি। সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের ১ নভেম্বর জিজেএন চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার অনুরোধ জানায়। এ জন্য দুটি অনলাইন ফরম পূরণ এবং দুটি ই-মেইল পাঠানো হয়েছে। সংগঠনটি তাদের আবেদনে প্রকাশ্য নথি ও আইনি তথ্য তুলে ধরে বিধিনিষেধের আইনগত ভিত্তি এবং বাস্তব প্রয়োগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
চার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জিজেএনের আবেদন
জিজেএনের প্রথম আবেদনটি পাঠানো হয়েছে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক জিনা রোমেরোর দপ্তরে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণ, মেয়াদ এবং এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে সরকারের ব্যাখ্যা চাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
জাতিসংঘের বিশেষ পদ্ধতির আওতায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কোনো দেশের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সুপারিশ করতে পারেন। তবে এ ধরনের সুপারিশের মাধ্যমে সরাসরি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, জিজেএন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কাছে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তাদের মূল্যায়ন হালনাগাদ করার অনুরোধ জানিয়েছে। এ জন্য সংস্থাটির নির্ধারিত রিপোর্টিং ফরম পূরণ এবং ই-মেইল নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জেনেভা কার্যালয়ে পাঠানো বার্তায় বিষয়টি বাংলাদেশবিষয়ক গবেষণা দলের কাছে পাঠানোর অনুরোধ করেছে জিজেএন। বিশেষ করে যাচাইযোগ্য ঘটনা ও তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছে তারা। সংগঠনটির দাবি, এ আবেদনের সঙ্গে কোনো গোপন সাক্ষ্য বা ভুক্তভোগীদের পরিচয় প্রকাশ করতে পারে—এমন তথ্য দেওয়া হয়নি।
চতুর্থত, কমনওয়েলথ সচিবালয়ের যোগাযোগ ফরমের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি। ফরম জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও এখন পর্যন্ত চার প্রতিষ্ঠানের কোনোটি থেকে আনুষ্ঠানিক বা বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা ও নাগরিক নিরাপত্তার উদ্বেগ
জিজেএনের এ উদ্যোগের পেছনে সংবাদমাধ্যমের ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে এসেছে। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে ভবনের ছাদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন পত্রিকাটির ২৮ জন সাংবাদিক ও কর্মী। পরে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করেন।
এ ধরনের হামলা শুধু সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকিতে ফেলে না, বরং সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনা স্বাধীনভাবে প্রকাশের পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সাতটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যম সংগঠনও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছিল।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও মানুষের অংশগ্রহণের অধিকার
রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কার্যক্রমে গতি কমেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে আছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে।
নিউজ ইন ট্রেন্ডসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অর্থনৈতিক তথ্য জিজেএনের চার প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো আবেদনের নিজস্ব অনুসন্ধান বা সিদ্ধান্ত নয়; বরং নাগরিক অংশগ্রহণের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বোঝাতে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে কর্মসংস্থান, নীতিনির্ধারণ ও সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখনো আসেনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ নভেম্বর পর্যন্ত জিজেএনের কাছে চার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া আসেনি। অর্থাৎ আবেদন পাঠানো ও অনলাইন ফরম জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও এখনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পাঠানো একটি চিঠির উল্লেখও প্রতিবেদনে রয়েছে। তবে সেটি জিজেএনের ২০২৬ সালের নভেম্বরের উদ্যোগের অংশ নয়; এটি আলাদা একটি পূর্ববর্তী নথি।
জিজেএনের এই উদ্যোগের পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টি পর্যালোচনা করে কোনো অনুসন্ধান, তথ্য চাওয়া, সংলাপ কিংবা প্রকাশ্য বিবৃতি দেয় কি না, তার ওপর। আপাতত উদ্যোগটি বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার একটি নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
