স্বাধীন মতপ্রকাশ ও শিক্ষার অধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা, স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়াই শিক্ষক বরখাস্ত ও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার
বাংলাদেশের ২০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক পরিচয়, পূর্ববর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন কিংবা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
৩ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত ‘Bangladesh: Academics Allegedly Targeted for Supporting Hasina’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের চাকরি থেকে অব্যাহতি, সাময়িক বরখাস্ত, পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা এবং শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ নিশ্চিত করা হয়নি।
এইচআরডব্লিউর উপপরিচালক (এশিয়া) মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক ও মতপ্রকাশের ঐতিহ্য রয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত একটি সরকারের রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে ভয় পাওয়ার কথা নয়। অতীতের দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি না করে বাংলাদেশকে সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পূর্ববর্তী সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করার কারণে কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত না থাকারই প্রমাণ হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে মুক্ত চিন্তা ও মতবিনিময়ের জায়গা, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠান নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার অভিযোগ
প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন ৪৪ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে আরও ২৫ জন শিক্ষকের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়।
এই পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে শুরুতে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য শৃঙ্খলাভিত্তিক তদন্ত ছিল না বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটি। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছয়জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং আরও ১৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৬ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার এবং তাদের পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটি দাবি করেছিল, এসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত থাকার ছবি, ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, অভিযুক্ত অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যথাযথ কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। আরও ২৭৭ আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অনেকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ক্যাম্পাসে আসছেন না।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ শিক্ষক বরখাস্ত, ৩৪ জনের কার্যক্রম সীমিত
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে ১২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, সাময়িক বরখাস্ত অথবা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এ ছাড়া আরও ৩৪ জন শিক্ষকের পদাবনতি ঘটানো হয় কিংবা তাদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সীমিত করা হয়।
এইচআরডব্লিউর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনসম্মত শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
প্রতিবেদনে অধ্যাপক পূর্বা ইসলামের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের এই শিক্ষককে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগপন্থী একটি মিছিলে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির প্রকাশিত ওই মিছিলের ভিডিও বিশ্লেষণ করে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, সেখানে পূর্বা ইসলামকে স্লোগান দিতে দেখা যায় না।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারের বিরুদ্ধেও শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তবে তিনি এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, আন্দোলনের পুরো সময় তিনি ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিলেন না।
তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগ
রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এইচআরডব্লিউর তথ্যমতে, সেখানে ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৮৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এইচআরডব্লিউর মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিষয়ক আইনের লঙ্ঘন হয়ে থাকতে পারে।
৪০৪ শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনার অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য হওয়ার কারণে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করা একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এইচআরডব্লিউকে বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন না দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত থাকার কারণে শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে টার্গেট করা হচ্ছে।
তার ভাষায়, তারা ক্লাস নিতে পারছেন না, গবেষণা করতে পারছেন না, কোনো কাজই করতে পারছেন না।
অধ্যাপক মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমানের ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ২০১৭ সাল থেকে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি ছাত্র আন্দোলনকে ‘অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এইচআরডব্লিউ ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, সেখানে তার মুখে এ ধরনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে তিনি গণহত্যায় উসকানি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়। অধ্যাপক মশিউর রহমান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আয়োজনে ওই বৈঠকে সব উপাচার্যের উপস্থিত থাকার কথা ছিল এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণও তাকে দেওয়া হয়নি।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার সুপারিশ করে। বর্তমানে তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শিক্ষকদের বিষয়েও উল্লেখ
প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তিনজন শিক্ষক দণ্ডিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন কারাগারে রয়েছেন এবং আরেকজনের বিচার চলছে।
অর্থাৎ সংস্থাটি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রতিশোধমূলক শাস্তির অভিযোগের পাশাপাশি ২০২৪ সালের সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুতর অপরাধের বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টিও আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পুনরাবৃত্তি বন্ধের আহ্বান
এইচআরডব্লিউর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবাধীন ছিল। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া এবং বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা ছিল।
কিন্তু একটি সরকারের পরিবর্তনের পর একই ধরনের রাজনৈতিক পক্ষপাত ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ নতুন করে শুরু হলে তা দেশের উচ্চশিক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, কাউকে কেবল রাজনৈতিক বিশ্বাস, দলীয় সংশ্লিষ্টতা কিংবা পূর্ববর্তী সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করার কারণে শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে সহিংসতা বা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা হচ্ছে না।
এইচআরডব্লিউর মূল বক্তব্য হলো, অপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে প্রতিশোধ নেওয়া এক বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে কারও রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত তদন্তের ভিত্তিতেই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—যে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে, সেই একই দমন-পীড়ন যদি নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের অধীনে ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের বিরুদ্ধে ফিরে আসে, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রকৃত অর্জন কোথায়?
তথ্যসূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ৩ নভেম্বর ২০২৬।
মূল প্রতিবেদন: Bangladesh: Academics Allegedly Targeted for Supporting Hasina – Human Rights Watch।
