এক্সক্লুসিভ: মাতৃভূমি থেকে দূরে, তবুও অদম্য-দৃঢ় সংকল্প: দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বললেন শেখ হাসিনা
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ইন্ডিয়া টুডে গ্লোবাল–কে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
আলাপচারিতায় বাংলাদেশের চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মুহূর্তে তিনি দেশের বর্তমান সংকট নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন— দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, দেশে গঠিত অনির্বাচিত ও জঙ্গিগোষ্ঠী-সমর্থিত ইউনূস সরকারের উত্থান— এসব বিষয় তিনি সরাসরি তুলে ধরেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া চারবারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর নির্বাসন জীবন, দেশের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা এবং বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন।
এই অপকট সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি নিজের শাসনকাল নিয়ে আত্মসমালোচনার কথাও বলেন এবং কোন পরিস্থিতিতে তিনি দেশে ফিরতে চান তা ব্যাখ্যা করেন।
একইসাথে তিনি সতর্ক করে বলেন— দেশে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রভাব বাড়ছে— যা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ভিত্তিকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।
নয়াদিল্লিতে তাঁর সুরক্ষিত অবস্থান থেকে শেখ হাসিনা এমনই সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেন। তবুও তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের দৃঢ়তা ও সংকল্পই তার সবচেয়ে বড় আশা।
সাক্ষাৎকার পর্ব
প্রশ্ন: আপনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং এখন আপনার দলও নিষিদ্ধ। আওয়ামী লীগ ছাড়া কি কোনো নির্বাচন বৈধ হতে পারে?
শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচনই বৈধ হতে পারে না। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া একটি অনির্বাচিত সরকারের তৈরি অসাংবিধানিক সনদের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে। এই অনির্বাচিত সরকার কোটি কোটি সমর্থক দ্বারা নয়বার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে তারা নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। তাদের কোটি কোটি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এর ফলে দেশের বৃহৎ অংশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
সরকারে থাকুক বা বিরোধী দলে— আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি যাকে এভাবে সরিয়ে রাখা যায় না। দেশের স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। না হলে বাংলাদেশ জনগণের সম্মতিতে পরিচালিত একটি সরকার পাওয়ার সুযোগ হারাবে। বাংলাদেশের মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, চায় নিষেধাজ্ঞা ও বর্জনের এই ক্ষতিকর চক্রের শেষ হোক।
প্রশ্ন: আপনি কি কখনো দেশে ফিরতে চান? কীভাবে সম্ভব?
শেখ হাসিনা: দেশের প্রতি আমার প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা অটুট। সারা জীবন আমি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি, সেই অঙ্গীকার আজও বদলায়নি। আমি দেশে ফিরতে চাই, তবে তার জন্য আগে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে— অর্থাৎ স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বহাল করতে হবে।
আমি ব্যক্তিগত ক্ষমতা চাই না। বিষয়টি কখনো আমার বা আমার পরিবারের নয়। বিষয়টি হলো— বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের প্রতিনিধি নিজেরা বেছে নিতে পারে, যেন দেশের অর্থনীতি এগোয়, রাজনীতিতে বহুমত থাকে এবং সাধারণ নাগরিকেরা তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক— সবার অধিকার রক্ষা হয়।
প্রশ্ন: যদি পেছনে ফিরে তাকান, কিছু কি ভিন্নভাবে করা যেত? কী কী?
শেখ হাসিনা: যেকোনো নেতা অতীতের দিকে তাকালে কিছু সিদ্ধান্ত দেখতে পারেন, যা হয়ত অন্যভাবে নেওয়া যেত। আমিও মনে করি— বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে যে অভিযোগ ছিল, তা আরও বেশি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত। আগে আমরা এমন বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করেছি, কিন্তু হয়তো এবার আরও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
পরিস্থিতি এতটা খারাপ না হলে, আমরা ঘটনাক্রমে প্রথম মৃত্যুর পরই যে স্বাধীন তদন্ত কমিটি করেছিলাম, সেটি সম্পন্ন করতে পারতাম। ইউনূস ক্ষমতা দখলের পর সেই তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো— যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের কাছে আমরা সত্যটা জানাতে পারিনি। আর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তথাকথিত তদন্ত শুধু দায় চাপানোর জন্য— যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগকে দুর্নাম করা যায়।
তবুও, আমি আমাদের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ হিসেবে যা অর্জন করেছি, তা নিয়ে দৃঢ়ভাবে গর্ব করি। আমাদের যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্প্রসারণ, প্রতিদিনের জীবনে পরিবর্তন এনে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তুলে আনা— এসবই বাংলাদেশের বড় অর্জন। বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী ও মেধাবী— আর তাদের শক্তিকেই আমরা কাজে লাগিয়েছি, যাতে ১৫ বছরে জিডিপি ৪৫০% বৃদ্ধি পায়।
ইউনূসের মতো মানুষরা আমাদের কাজের সমালোচনা করতে পারে, কিন্তু তারা দেশের জন্য আমাদের অর্জনের সামান্য অংশও কখনো করে দেখাতে পারবে না।
প্রশ্ন: আজ বাংলাদেশে উগ্রবাদ বাড়ছে। আপনি কি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীত? দেশ কোন দিকে যাচ্ছে?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ যে পথে যাচ্ছে, তা নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা এখন যা দেখছি— হঠাৎ গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা— এগুলো আমাদের দেশকে সেই ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল।
আজ বাংলাদেশ বহু বছরের তুলনায় বেশি বিভক্ত ও অনিশ্চিত অবস্থায় আছে। ইউনূস সরকারের সঙ্গে যুক্ত চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো সংগঠিতভাবে সংবিধান ও আইনের শাসনকে দুর্বল করছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভয়ে দিন কাটাচ্ছে, সাংবাদিকরা সত্য সংবাদ প্রকাশের জন্য হামলার শিকার হচ্ছে, আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে।
এটা সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছি। আমি আশঙ্কা করছি— বহু বছরের অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। তবুও আমার বিশ্বাস আছে— বাংলাদেশের মানুষের দৃঢ়তা ও সাহসই দেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে।
প্রশ্ন: ইউনূস সরকারের পেছনে কারা আছে? তিনি কি কোনোভাবে আপসকামী বা প্রভাবিত?
শেখ হাসিনা: ইউনূস এবং তার ঘনিষ্ঠরা দেশের মানুষের সেবা করার চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার দিকেই বেশি মনোযোগী। তার শাসনামল মূল্যায়ন করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়— তিনি আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলেছেন এবং চরমপন্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও মদদ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছেন।
ইউনূস বহু বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক অভিজাত সমাজে তিনি ছিলেন একসময়ের জনপ্রিয় অতিথি— তারা ভুল ভেবেছিলেন যে তিনি তাদের উদার মূল্যবোধে বিশ্বাসী। কিন্তু বাস্তবতা হলো— তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করেছেন, সংবিধানকে উপেক্ষা করেছেন এবং যে কোনো ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দিয়েছেন।
তার শাসন পুরোপুরি দাঁড়িয়ে আছে চরমপন্থী গোষ্ঠী ও সেই সব অপশক্তির ওপর, যারা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে নষ্ট করতে চায়।
প্রশ্ন: পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো আবার বাংলাদেশে সক্রিয় হচ্ছে। এটি কতটা উদ্বেগজনক এবং ভারত কী করতে পারে?
শেখ হাসিনা: কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠা সত্যিই উদ্বেগের। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। আমার সরকার এসব শক্তি দমনে নিরলস কাজ করেছে— প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে এবং বাংলাদেশের মধ্যপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে।
কিন্তু বর্তমান ইউনূস প্রশাসন চরমপন্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে এসব বিপজ্জনক গোষ্ঠী বেড়ে উঠতে পারছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন। আর আমি বিশ্বাস করি— আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারতকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
সব বড় রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফেরানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়— এবং এতে ভারত–বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। ইন্ডিয়া টুডে গ্লোবাল
