ঢাকা, ২৯ নভেম্বর ২০২৫: চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫ আজ রাজধানীর একটি হোটেলে শুরু হয়েছে। ‘ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ বিষয়ক এই সম্মেলনে সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নিয়েছেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তারা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনৈতিক নীতি ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন। হা-মিম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদসহ অন্যান্য ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতির সাম্প্রতিক সংকটের আশঙ্কা তুলে ধরে সংস্কারের সুপারিশ করেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, “দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন সমস্যা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের যাত্রা আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে পারে।”
গভর্নর আরও জানান, অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যাংক রেগুলেশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে।
হা-মিম গ্রুপের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো তীব্রভাবে তুলে ধরেন। প্রায় ৪০ বছরের ব্যবসায়িক জীবনে এমন সংকটের সাক্ষাৎকার না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশের অর্থনীতি এখন গভীর সংকটের মুখোমুখি। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, ভ্যাট-ট্যাক্সের হার বাড়ানোর মতো নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য এটি বিপর্যয়কর হবে। ইতিমধ্যে অর্থনীতির নিম্নমূখী প্রবণতায় ১৪ লাখ মানুষ চাকরী হারিয়েছে।”
এ কে আজাদ আরও বলেন, এসব নীতির প্রভাব অর্থনীতি ও জনজীবনে কী পড়বে তা খতিয়ে দেখা হয়নি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এমন নীতি চালু হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আরও কমে যাবে এবং শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তবে তিনি সুপারিশ করেন, ব্যবসায়ীদের ‘বিনিয়োগ দূত’ হিসেবে কাজ করতে হবে এবং দেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর ডিরেক্টর জেনারেল এ কে এনামুল হক বক্তব্যে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, “বর্তমানে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে গৃহস্থালীর ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় হচ্ছে। সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।” তিনি আশঙ্কা করেন যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা না থামলে ব্যবসায়িক আস্থা ফিরে আসবে না এবং দেশের জিডিপিতে বিনিয়োগের হার ০.৪৫ শতাংশ থেকে বাড়ানো সম্ভব হবে না। তবে তিনি ইতিবাচকভাবে বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার সম্মেলনের মতো উদ্যোগ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের আলোচনা বাড়িয়ে সামাজিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের উপর আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, “দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ ইতিবাচক, কিন্তু এর পাশাপাশি ঋণের সুদের হার কমাতে হবে এবং এসএমই খাতে বিনিয়োগের সুবিধা বাড়াতে হবে।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতা না মিটলে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশের নিচে নেমে যাবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বক্তব্যে অর্থনৈতিক নীতির স্থিতিশীলতার উপর জোর দেন। তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক নীতির অস্থিরতা ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করছে। সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।” তিনি আশঙ্কা করেন যে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করলে গৃহস্থালীর ক্রয়ক্ষমতা আরও ক্ষয় হবে এবং বিনিয়োগ কমে যাবে।
সম্মেলনের আয়োজকরা জানান, এই দু’দিনের অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন সেশন অনুষ্ঠিত হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সম্মেলন দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, যদি বক্তাদের আশঙ্কা ও সুপারিশগুলো বাস্তবে রূপায়িত হয়। সম্মেলনের ফলাফল দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
