মালিহা মেহনাজ শায়েরী
২০০৫ এর টেলিভিশন মিডিয়ার যুগ থেকে শুরু করে এখন ২০২৬ এর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ… বাংলাদেশে আমার একক উপস্থাপনায় যে হাজারো পর্ব প্রামাণ্যচিত্র বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হয়ে আসছে, পর্ব সংখ্যার হিসেবে এবং দীর্ঘ ২২ বছর ধরে বিরতি ছাড়া একটানা ডকুমেন্টারির মতো চ্যালেন্জিং একটি ট্র্যাকে নারী হিসেবে কাজ করার রেকর্ড সম্ভবত আমি ছাড়া আর কারও ঝুলিতে নেই!
আপাত দৃষ্টিতে দীর্ঘ সময় টিভি পর্দায় চেহারা দেখা যায় যাদের, তাদেরকে মানুষ সেলেব্রিটি বলে। কিন্তু আমাকে যখন কোন দর্শক বা বন্ধু স্বজন সেলিব্রিটি বলে.. আমি ভীষণ বিব্রত হই! কারণ সেলিব্রিটি সুলভ মনোভাব আমি একদিনের জন্যও পোষণ করতে পারিনি। বরং খুব সাধারণ জীবন যাপনে আমি সাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
অনেক জাকঁ-জৌলুস, পোষাকের চাকচিক্য, এগুলো ছোটবেলা থেকেই আমাকে কখনও টানেনি, এখনও টানেনা। ছোটবেলায় আব্বু কখনও ১০০০ টাকা দিয়ে ঈদের জামা কিনে আনলে আমি রাগ হতাম, বলতাম… “৫০০ টাকা দিয়েও তো জামা পাওয়া যায়..!”
আমি যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাই, আমার বাসার সামনের সব্জিওয়ালা, মহল্লার দোকানদার, বন্ধু-স্বজন বা পরিচিত কেউ, বা যারা আমার দর্শক, তারা আমার অতি সাদামাটা পোষাক আর চলাফেরা দেখে ভীষণ অবাক হন, অনেকে বিরক্তও হন… অন্তত যুগের সাথে বা নিজের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে আরেকটু দামী বা চকচকে জামাজুতো কি পড়া যায়না..? আমি বলি.. আমি ভাই সাধারণ মানুষ, সাদামাটা ভাবে থাকতেই যে আমি পছন্দ করি.., এটাই যে আসল আমি! এটাই আমার বৈশিষ্ট্য, এতেই আমি সন্তুষ্ট, গর্বিত!
আমি যেনো এমনই থাকি, তথাকথিত চাকচিক্যের গড্ডালিকা প্রবাহে যেনো কোনদিন গা না ভাসাই। অনেক দামী জামা জুতো’র আকর্ষণ কিংবা আত্মঅহমিকা আমাকে যেনো কখনই স্পর্শ না করে। ক্যামেরার সামনে যেটুকু শুধু আমার ঐতিহ্য উপস্থাপনে প্রয়োজন, আমার সাধারণ রসদ দিয়েই সেটুকু নিজেকে গুছিয়ে নেই মাত্র! ক্যামেরার সামনে উপস্থাপনায় আমার পড়া শাড়িগুলোর বেশিরভাগই আমার মায়ের।
ক্যামেরার পেছনের আমি অতি সাধারণ পরিশ্রমী কর্মী। সেলিব্রিটির সংজ্ঞা আপাতদৃষ্টিতে মানুষের কাছে যা, সেই সেলিব্রিটি সম্বোধনে আমি একটুও খুশী হইনা। বরং সাদামাটা হয়ে সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের কাছাকাছি পৌঁছে অনেক অদেখা সুখ-দুঃখ দেখে শিখে নিজেকে সমৃদ্ধ করার অর্জনটুকুতেই আমি খুশী!
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে পড়াশোনা করে, আইনজীবী হয়ে, আইনে শিক্ষকতা করে, সেমিনার সিম্পোজিয়ামে গিয়ে আমার যা কিছু শেখা বা অর্জন; Panorama Creators প্রতিষ্ঠানে ডকুমেন্টারির সুবাদে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার সে অর্জনের ঝুলিকে অনেক অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে। আবার, বাংলাদেশের প্রান্ত থেকে প্রত্যন্তে ছুটে বেড়িয়ে মানুষের জীবন নিয়ে যেসব কাজ করেছি… সেই অভিজ্ঞতা আমার জীবনবোধকে করেছে প্রজ্ঞাময়..সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ..!
আজকাল দেখি এক আধবার টিভিতে চেহারা দেখিয়েই অনেকে নিজেকে আকাশের তারকা মনে করে..তাই বুঝি মাটিতে তাদের পা পড়েনা, মাটিতে না হেঁটে তারা উড়ে উড়ে জগত সংসারে বিচরণ করে! শিল্পের শ বোঝেনা যারা, নান্দনিকতার ন বোঝেনা যারা, সামাজিক মূল্যবোধের ধারেকাছে নেই যারা, অশালীন অদ্ভুত চকচকে পোষাকে রং মেখে শো-অফ করতেই ব্যস্ত যারা, নিজের একটা ঢোল বানিয়ে নিজেই বাজাতে বাজাতে কতবার যে ফাটিয়ে ফেলে..তার হিসেব নেই যাদের…. এই শ্রেণীর স্বঘোষিত তারকাদেরই তো সেলিব্রিটি বলেন আপনারা তাইনা…? তাদের পিছেই তো এক বিশেষ শ্রেণীর সাংঘাতিকরা ঘুড়ে বেড়ান অদ্ভুত খাপ ছাড়া কিছু কথা জোগার করে ভিউ বাড়ানোর নেশায়…!
আর আমি রেকর্ডধারী হয়েও আজন্ম বে-আক্কেল মানুষ.. যে আজ পর্যন্ত নিজের একটা ঢোলই বানাতে পারলাম না, বাজাবোতো দূরের কথা! আসলে এসব ঢোল আমি বাজাতে জানিনা..রক্তে নেই। পারি শুধু নিজের শ্রম, ঘাম, মেধা, প্রতিভা… আল্লাহ যা কিছু দান করেছেন সব উজাড় করে দিয়ে এমন কাজ করতে যা থেকে মানুষের বিনোদন, জ্ঞানার্জন, উপকার হয়..! সামাজিক দায়বদ্ধতা যে আছে, সেখানে আমার অবদানটুকু যুক্ত হয়! নিজের রাষ্ট্রের জন্য ভাল না মন্দ করছি তা বিবেকের কাছে স্পষ্ট হয়! তবেই কাজ করে আত্মতৃপ্তি আসে!
কাজ থেকে আমার আরও এক আত্মতৃপ্তি… অসংখ্য বাবা মা সহ পুরো পরিবার আমার অসংখ্য দর্শক আছেন, শুধু দর্শক বললে ভুল হবে। যদিও আমাকে তারা টিভিতে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেন তবুও আমাকে তাদের পরিবারের সদস্য মনে করেন। সেই আঙ্কেল বা আন্টিরা তাদের ছেলেমেয়েদের বলতেন.. “এই তোরা তাড়াতাড়ি পড়া শেষ কর, আমার মেয়ে শায়েরীর অনুষ্ঠান শুরু হবে।” আমি তাদের কাছে কোন সেলিব্রিটি নই, তাদের ঘরের মেয়ে! অসংখ্য দর্শক আছেন যারা তদের প্রথম সন্তান কন্যা হলে নাম রেখেছেন আমার নামে..! এমন অনেক দর্শক আছেন যারা তাদের সন্তানদের শিল্পসম্মতভাবে নিজের দেশ সম্বন্ধে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আমার প্রোগ্রাম দেখান! আমার অসংখ্য ক্ষুদে দর্শক আছে যারা শায়েরী আন্টির প্রোগ্রাম দেখে দেখে ভাত খায়..! আমার ঝুলিতে আছে নিঃস্বার্থ ভালবাসায় মোড়া এতসব অমূল্য প্রাপ্তি! এসবের থেকে বড় প্রাপ্তি আজকালকার সেই স্বঘোষিত সো-কলড সেলিব্রিটিরা সম্ভবত পায়না!
পোস্ট করা ছবিগুলো এক ছোট ভাই আমাকে পাঠিয়েছে। বললো…. “আপু মনে আছে.., আজ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সালের এই দিনে NTV আপনাকে সেলিব্রিটি হিসেবে আমন্ত্রিত অতিথি করেছিল শুভসন্ধা অনুষ্ঠানে। ছবিগুলো যত্ন করে টিভি থেকে তুলে রেখেছিল আব্বা। আব্বা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়ে মনে করিয়ে দিতে বললো.!” অবাক হয়েছি, মুগ্ধতায় চোখ ভিজেও গিয়েছে..! এঁরা আমার দর্শক, আমার ব্লেজিং! আমার সেই দর্শক বাবার সম্মানেই তাঁর টিভি থেকে যত্ন করে তুলে রাখা এতো বছর ধরে আগলে রাখা আমার সেই ছবিগুলো পোস্ট করলাম..!
দেশজুড়ে এবং দেশের বাইরে আমার এমন বাবা আছেন অনেক! আমার এমন মা আছেন অনেক, আমার এমন ভাই বোন সন্তান আছে অনেক! আমি আমার সেই দর্শকদের কাছে তাঁদের ঘরের মেয়ে হয়েই থাকতে চাই! সেলিব্রিটি হতে চাইনা কখনো..!
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
