আফজাল হোসেন
অনেকদিন হয়ে গেছে খাবার দাবার নিয়ে লেখা হয় না। হঠাৎ ছন্দার সাথে দেখা। খাবার দাবারের কোনো বন্ধুর কথা মনে এলে বা সামনে এসে গেলে মনে হয়, অদৃশ্য থেকে কেউ হেঁকে বললো সিসিম ফাঁক, অমনি ঘড় ঘড় শব্দ করে খুলে যেতে থাকে স্মৃতির দরজা।
ছন্দার সাথে দেখা হয়ে গেলো সাত সমুদ্র আর তেরো নদীর পারে। যেখানেই হোক, প্রিয় মানুষের সাথে হঠাৎ দেখা হওয়া মানে মনের আকাশে ঝিমানো সূর্য গা ঝেড়ে আলস্য ফেলে দিয়ে ঝলমল করে হেসে ওঠে।
জ্যাকসন হাইটসের ফুটপাতে আমি আর মনা দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের সাথে ছিল সোহেল আর রুবা। সোহেল আমাদের বন্ধু সৌরভের ছোট ভাই আর রুবা তার স্ত্রী।
জ্যাকসন হাইটসে গাড়ি রাখার জায়গা পাওয়া যায় না। ডেরা রেস্তোরাঁর উল্টো দিকে দেখা গেলো, একটা ফাঁকা জায়গা আছে। এরকম পার্কিং মিলে গেলে গাড়ির চালক যেনো আকাশের চাঁদ বা লটারিতে কয়েক লক্ষ টাকা পেয়ে গেছে মনে করে।
সোহেলের খুশি হওয়া দেখে মনে হলো, কথা অতিরঞ্জিত নয়। খুব দ্রুত ফাঁকা জায়টায় গাড়ির মাথাটা ঢুকিয়ে দেয় সে। সেখানে গাড়ি রেখে আমরা অনেকটা হেঁটে ফুচকা খেতে গিয়েছিলাম।
ফুচকা চমৎকার ছিল। কাগজের কাপে দুধ চিনি দেয়া চা, সেও ছিল দারুণ। খাওয়া, বেড়ানো শেষ করে ফেরার পথে সোহেল আমাদের বলে, আপনাদের অতটা হাঁটতে হবে না দাঁড়ান এখানটায়, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।
গাড়ির অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়েছিলাম। ফোনে কোনো বার্তা এসেছে কিনা দেখবার জন্য পকেট থেকে ফোনটা বের করেছি, ঠিক সে সময়টাতে পিছন থেকে কাউকে বলতে শুনি, তোমার মুখ দেখতে পাচ্ছি না তবে পাশে তোমার বউটাকে দেখে ধরে নিচ্ছি, মানুষটা তুমিই হবে।
এ এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকলে মনে হয় না দেশের বাইরে আছি। ডাইনে বামে, সামনে পিছনে দেশি মানুষ, পোশাক আর বাংলায় কথা বলাবলি শুনতে পাওয়া যায়। ফুটপাতে চা সিঙ্গাড়া, লুঙ্গি, বোরখা বিক্রি হচ্ছে।
এক জায়গায় বাংলায় লেখা ট্রাভেল এজেন্সি। তার পাশে প্যাকিং বক্সের কাগজে হাতে লিখে রাখা, আমরা বাংলায় কথা বলি। আর এক জায়গায় দেখতে পাই ডাইনে বামে উভয়দিকে ভাতের হোটেল। একটা থেকে শুঁটকির গন্ধ পাই। অন্যটার প্রবেশ পথে লাল সালু কাপড়ে মোড়া বিরিয়ানির ডেক বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।
এইসব পার হয়ে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা একটা জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে। মোবাইল ফোনের পর্দায় আমার চোখ। পিছন থেকে শুদ্ধ উচ্চারণে শুনি, কেমন আছো? উত্তরে উচ্ছসিত হয়ে মনাকে বলতে শুনি, আপনি কেমন আছেন?
কৌতুহল জাগে, কাকে দেখতে পেয়ে মনা এতো উচ্ছ্বসিত হলো। দেখতে পাই না তাকে। পিছন থেকে মানুষটা জড়িয়ে ধরেছে, তাতে বুঝতে পারি, অতি আপন কেউ।
কৌতুহল বাড়ে, কে এই আপন? সকালে কফি খেতে খেতে সাগর বলেছিল, ছন্দা এখন এ শহরেই থাকে। নাটকের মতো মনে হয়, সকালে যার কথা বলেছে বিকালে তার সাথে দেখা হয়ে যাবে!
জীবন কখনো নাটকের চেয়েও নাটকীয়। দেখতে পাই ছন্দাকে। ঠিক বলতে পারবো না, বর্ণনা করতে পারবো না সামনে ছন্দাকে দেখে, তার ভোরের মতো শুভ্র হাসি দেখে কেমন বোধ হলো আমার। আমি হা করে তাকিয়ে থাকি। নিজের হাসিটা দেখতে পাই না কিন্তু বুঝতে পারি, সেটা বোকার মতো।
ছন্দা বলে, কদিন আগে সাগরের সাথে ফোনে কথা হয়েছে, বলেছিল তোমরা আসবে নিউইয়র্কে। আমি জানাই, সকালে সাগর বলেছে, এই শহরে আছো তুমি। ভেবেছি, দেখা হবে। এভাবে দেখা হয়ে যাবে তা ভাবিনি।
ছন্দা হাসে, আমিও ভেবেছি দেখা হবে কিন্তু ঘরে মাছ তরকারি নেই, হঠাৎ মনে হলো যাই কিনে আনি, সে উদ্দেশ্যে বেরিয়ে তোমাদের সাথে দেখা হয়ে গেলো। জাকারিয়া ঘুমাচ্ছে, আমি এঘর ও ঘর করছিলাম, হঠাৎ মাছ তরকারির কথা কেনো মনে হয়ে যাবে, এখন বুঝতে পারছি।
মনা পাশ থেকে বলে, চিত্রনাট্য ওপরঅলা যেভাবে লিখেছেন সেভাবেই ঘটবে সবকিছু।
অবাক হওয়া খানিকটা কমেছে আমার।
– ছন্দা এভাবে আমাদের দেখা হওয়ার কথা নয়। আমাদের গাড়ি অনেক দূরে রাখা। হেঁটে আমরা সেদিকেই যাচ্ছিলাম। সোহেল, যে আমাদের এদিকটায় এনেছে, হঠাৎ বললো, আপনারা এখানেই অপেক্ষা করেন, আমি গিয়ে গাড়িটা আনছি।
ছন্দা একটু আগে বলা মনার কথাটা আবার নিজের মতো করে বলে, চিত্রনাট্য পূর্ব থেকে এভাবেই লেখা।
