মীর রবি
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই অর্ধশত বছর পেরিয়েও স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক থামেনি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে জাতির মাঝে তৈরি হয়নি ঐক্য। বিশেষত ‘জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, স্বাধীনতার ঘোষণা’র মতো স্পর্শকাতর ও মিমাংসিত ইতিহাস নিয়ে আজও বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। ইতিহাস বিকৃতি ও বিতর্ক তৈরির চেষ্টা নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যায়। তাঁদের দীর্ঘশূন্যতার সুযোগে ক্ষমতাসীনদের মধ্যস্থতায় একাত্তরের বিরোধী গোষ্ঠী দ্রুতই রাষ্ট্র ক্ষমতার নিকটবর্তী হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেন্দ্রিক নানা বয়ান ও নানা মতবাদ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং চীনপন্থী কতিপয় বাম রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের তৈরিকৃত মতবাদে মানুষ বিভ্রান্ত হতে শুরু করে। তা আজও থেমে নেই।
স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ অস্থিরতা ও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন এক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয় এই দেশে। সেই ন্যারেটিভে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের বৃহৎ একটি অংশ এখন দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে প্রতিনিধিত্ব করছে। যাদের হাত দিয়ে আবারও মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা প্রসঙ্গে পুরোনো বিতর্কই যেন নতুন মোড়কে হাজির করা হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধপন্থী আপোষহীন মানুষেরা। লাঞ্ছনা-বঞ্চনা থেকে শুরু করে এমনকি টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা।
ইদানিং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী গোষ্ঠী ‘বিহারী’দের হত্যার দায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার করার দাবিও উঠেছে। একদা অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান ভাঙার অপরাধে এদেশে একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হবে’। তাঁর সেই বক্তব্য যেন আজ বাস্তবায়নের দিকেই অগ্রসরমান।
অনলাইন দুনিয়ায় বুঁদ থাকা বর্তমান সময়ের ইতিহাস বিমুখ প্রজন্মের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পাকিস্তানপন্থী ইতিহাসের বয়ান প্রতিস্থাপনের চেষ্টায় লিপ্ত। মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ‘চব্বিশের অভ্যুত্থান’কে। পরোক্ষভাবে তারা সাতচল্লিশের দেশভাগকে ‘প্রথম স্বাধীনতা’ ও চব্বিশকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় বলে প্রতীয়মান। ‘একাত্তর’ তাদের দৃষ্টিতে ভারতীয় ষড়যন্ত্র এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। অনেকাংশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে স্বাধীন পাকিস্তান থেকে পূর্ব বাংলাকে ভারতের ঔপনিবেশ বানানোর যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে এরা। এতে তথাকথিত ভারতবিরোধী রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর অবান্তরতা আগুনে ঘি ঢালার মধ্য দিয়ে মিথ্যা ইতিহাস তৈরির প্রক্রিয়াকে সত্যের আবরণ দান করছে। যার ফলে দেশের নতুন প্রজন্মের বৃহৎ এক অংশের মাঝে এসব বিতর্কিত ইতিহাসভাষ্য গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালি আত্মভোলা জাতি হিসেবে আখ্যায়িত। তারা বরাবরই আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগে। নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে শংকর জাতি হিসেবে বিবেচিত বাঙালির সংকীর্ণতা নিয়ে বহু কথার প্রচলন রয়েছে। এদিক থেকে ভাবলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা বিমুখ, অনিচ্ছুক এক জাতিকে ঔপনিবেশিকতা ও পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি এনে দিয়েছিলেন। যে জাতি নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গৌরববোধ করবার চেয়ে বহিরাগত শাসকদের কর্তৃত্বেই বেশি উৎফুল্ল হয় এবং তাদের পরিচয়কেই নিজের পরিচয় বলে জাহির করতে চায়। তাদের স্বাধীনতার চেয়ে পরাধীনতাই অধিক কাম্য, এ নিয়ে সংশয় নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের তথাকথিত সম্পর্ক উন্নয়নের এজেন্ডা নিয়ে সরব হওয়া ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলেগুলোয় চোখ রাখলেই এর প্রমাণ মিলবে। সেই সঙ্গে কতিপয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রোপাগান্ডাও আমাদেরকে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চারিদিকে যে পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা একাত্তর সময়কালকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেসময় জামায়াত স্বাধীনতাযুদ্ধকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছিল। ব্যবহার করেছিল ধর্মীয় ট্রাম্পকার্ড। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল খুবই স্পষ্ট এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ‘প্রধান সহযোগী’ হিসেবে তারা এই দেশে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম গণহত্যায় সহায়তা করেছে। নৃশংস সব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাতেও তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত।
স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও বাঙালি জাতীয়তাবাদবিরোধী সাম্প্রদায়িক দলগুলো বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আওয়ামী সরকারের পতনের পরবর্তী সময় থেকেই তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে এদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়েও। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অবস্থানকে তারা আবারও সামনে এনেছে। পূর্বের মতোই ধর্মীয় ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে বাঙালিত্বের বিরুদ্ধে স্নায়ু যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এরা। সরকারও সেসব বিষয়ে নিরব থেকেছে এবং এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যাতে সরকারের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ রয়েছে, কেননা সেসব ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের কোনো পদক্ষেপ ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশের আঁতুড়ঘর হিসেবে খ্যাত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ‘ধানমন্ডি ৩২’ ভাঙার ঘটনা এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসেবে ‘বাউলদের আক্রমণ, মাজার ভাঙচুর ও উচ্ছেদ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদান, কনসার্ট বন্ধ, নববর্ষ উদযাপনে বিরোধিতা, সংগীত শিক্ষক নিয়োগ’ বন্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এতে সরকারেরও সায় ছিল এবং আছে, তা বুঝতে আমাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা জাদুঘর, মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুর লুটপাটসহ দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল, ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্মারকচিহ্ন ভেঙ্গে ফেলা হলেও সরকার সেসব রক্ষার কোনো চেষ্টাই করেনি। বরং সরকার প্রধানের ‘রিসেট বাটন’ তত্ত্ব মুক্তিযুদ্ধপন্থী মানুষদের ব্যথিত করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা সচেতন মানুষদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ভাবনা অবান্তর নয় যে, একাত্তরে আমাদের লড়াই ছিল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী ও রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর বিরুদ্ধে । সেই যুদ্ধটাই এখন নতুন করে ভিন্ন আঙ্গিকে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই লড়াইটা মুক্তিযুদ্ধপন্থী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের। এই দুই বিভাজন থেকে বেরুবার পথ বাংলাদেশে আর হয়তো নেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌলবাদ প্রতিরোধের লড়াই। ফলে সংগ্রাম যে দীর্ঘকালীন হতে পারে, তা অনুমেয়। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে চিন্তায়, মননে, যুক্তি ও তর্কে।
বিগত আওয়ামী শাসনামলে অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অতিরঞ্জিত করে তুলেছে এবং মৌলবাদের সঙ্গে আপোষ করছে। এছাড়াও বিগত সময়কার ‘জঙ্গি দমননীতি’ নিয়েও মানবাধিকার ইস্যুতে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। এসব ঘটনাই বর্তমানে স্বাধীনতাবিরোধীদের পালে হাওয়া বইয়ে দিয়েছে এবং পক্ষান্তরে মৌলবাদীদের শক্তি যুগিয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারও সেই তালে তাল মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুরকে ‘আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছে। যা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার পথকে প্রচ্ছন্ন করে তুলছে।
একই সঙ্গে মৌলবাদী গোষ্ঠী ‘মুসলিম’ হিসেব আওয়ামী জুলুমের শিকার হয়েছে অভিযোগ তুলে তাদের পক্ষ নিয়ে মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কতিপয় বুদ্ধিজীবী এবং এনজিওসৃষ্ট সুশীল সমাজ। তৌহিদি জনতা কিংবা জুলাই নাম ব্যবহার করে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন মহলের নৈরাজ্য দেশের স্থিতিশীলতার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত হলেও, আশ্চর্যজনকভাবে এদের প্রেশার গ্রুপ আখ্যা দিয়ে জিয়ে রাখা হচ্ছে। সরকার ও সরকার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল উভয়েই প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন মত দমনে এদের ব্যবহার করছে। এক্ষেত্রেও মব বাহিনী ও তৌহিদি জনতার আক্রমণের প্রধান শিকার মুক্তিযুদ্ধপন্থী প্রগতিশীল মানুষেরা।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে গন্ডগোল বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়, তা ইদানিং হালে পানি পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাতেই ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত ৭ই মার্চের ভাষণ পাঠ্যপুস্তক থেকে বাতিল করা হয়েছে। নেই মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার, আল বদর, আল শামস হিসেবে জামায়াত-শিবিরের প্রসঙ্গ’ । এরই ধারাবাহিকতায় ৪৭তম বিসিএসের ‘বাংলাদেশ বিষয়াবলি’ বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ‘মহানন্দা’ সেটের ‘১’ নম্বর প্রশ্নে, ‘১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন’ এর মধ্যে দিয়ে ভাষা রাজনীতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে নাই করে দেওয়ার সুক্ষ্ম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে ‘প্রতিরোধ যুদ্ধ’, ঘৃণ্য পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে ‘দখলদার বাহিনী’ বলার মধ্য দিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাচ্ছে, এটা সন্দেহাতীত।
মুক্তিযুদ্ধকে ‘গন্ডগোল, গৃহযুদ্ধ কিংবা প্রতিরোধ যুদ্ধ’ এবং মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙালি সাধারণ জনতার জনযুদ্ধকে ‘মব’ বলা হলেও মুক্তিযুদ্ধপন্থী, প্রগতিকামী বা সমাজতন্ত্রপন্থী বলে পরিচয়দানকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠীসহ সুশীল সমাজের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। সেই সঙ্গে মৌলবাদীদের উত্থান নিয়েও তাদের উচ্চবাচ্য নেই। বরং তাদেরকে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে এক টেবিলে বসতে দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগকে ‘মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়ী আখ্যা’ দেয়া এসব দলের এমন নিরবতা ও দ্বিচারিতা প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াতের কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে বলে ধরে নেওয়াই যায়।
ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে ‘সহস্রাধিক শহিদ, ত্রিশ হাজার শহিদ, তিন হাজার শহিদ, আওয়ামী লীগের কেউ মুক্তিযোদ্ধা নন, তারা মুক্তিযুদ্ধ করে নাই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এদেশের স্বাধীনতা চাননি, তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, তাঁকে বঙ্গবন্ধু বলা যাবে না, তিনি জাতির জনক নন, ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস নয়, তা ‘কালো দিবস’, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর মুক্তিযুদ্ধের অংশ না, শেখ মুজিব পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, পাকিস্তানে পালিয়েছে’ এইরূপ বিভিন্ন ইতিহাস বিবর্জিত আপত্তিকর মন্তব্য নিয়েও দৃশ্যমান তেমন প্রতিবাদ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোরও প্রতিক্রিয়া নেই। বরং তারা অনেক ক্ষেত্রেই সম্মোহন উৎপাদকের ভূমিকা পালন করছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার এতোদিন পরেও মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীন না হওয়াটাও। চলমান ঘটনা প্রবাহ যেন প্রমাণ করতে চাইছে ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু আওয়ামীপন্থীদের’, আর কারো নয়! ‘আওয়ামী লীগ না থাকলে এদেশে মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু থাকবে না’, বহুল প্রচলিত বয়ানকেই সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করছে এই সময়। এ থেকে উত্তরণে বিএনপি কিংবা বাম দলগুলোর ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যথাযথ স্ট্যান্ড অদ্যাবধি নিতে পারেনি বরং আওয়ামীবিরোধিতার নামে একাত্তর ও বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে তাদের বিতর্কিত মন্তব্যসমূহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতের পক্ষেই গিয়েছে। এছাড়াও নানা সময়ে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও পরিবর্তন একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এই অপসংস্কৃতি জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এই পরিস্থিতির উত্তরণে রাজনৈতিক সমাধান জরুরি।
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে অন্তবর্তী সরকার নানা সময়েই চাপের মুখে পড়েছে। নেটিজেনদের প্রতিবাদে তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নন বলে দাবি করেছেন। এই দাবির স্বপক্ষে তাদের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো কথা বলেনি। দেশের ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বহু মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও একাধিক যাদুঘরে হামলা ভাঙচুর হলেও সেগুলোর সংস্কার বা রিক্রিয়েটের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তার কোনো নজিরও দেখা যাচ্ছে না। বরং এরই মাঝে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি সংরক্ষণের প্রকল্পও বাতিল করা হয়েছে। দেশের জন্মলগ্নের ইতিহাসের প্রতি এমন উদাসীনতা, অবহেলা বিস্ময়কর এবং সন্দেহের। এসব রক্ষায় রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর নীরবতাও উদ্বেগজনক এবং তাদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত, এনসিপি, বৈষম্যবিরোধীদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির কিছু সংখ্যক লোকজনকেও ভাঙচুরের ঘটনায় সরাসরি যুক্ত হতে দেখা গিয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক তৈরির প্রতিবাদে ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষেরা সরব হতে শুরু করেছে। টিভি টকশোতে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কগুলোর জবাব দিচ্ছেন। দলীয় বৃত্তের বাইরে সাধারণরাও ভয় কাটিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ‘বিতর্কিত ইউটিউবার ইলিয়াস ও পিনাকী ভট্টাচার্যের বক্তব্যের প্রতিবাদ’ দৃশ্য খানিকটা আশার সঞ্চয় করছে। একই সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক আপত্তিকর কথাবার্তার রুখে দিচ্ছে জনসাধারণও। যা স্বস্তিদায়ক। বাংলাদেশপন্থী মানুষ মাত্রই চান না, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী এভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠুক কিংবা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার মতো আবারও রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশ হোক। এক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যমত প্রয়োজন। দরকার জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আইনের মুখোমুখি করা। অন্যথায় এদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়বে, এনিয়ে অন্তত দ্বিমত কারো নেই।
লেখক পরিচিতি: কবি ও সমাজচিন্তক
