ঢাকা, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬: বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের দাম কমার সুফল না পেয়ে দেশে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অনুসারে, ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে উঠেছে, যা নভেম্বরে ছিল ৮.২৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত ৯.১৩ শতাংশ। টানা তিন মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, যা কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে তুলে ধরছে।
২০২৫ সালের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭৭ শতাংশ—দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতি এমন সময়ে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো উপাত্ত অনুযায়ি ডলার সংকট কেটে গেছে, রিজার্ভ বেড়েছে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, চাল, গম, সয়াবিন, চিনি, গুঁড়া দুধের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। উল্টো সবজি, চাল, ডাল, মাছ-মাংসের দাম চড়া থেকেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইএমএফের প্রেসক্রিপশন অনুসারে সুদহার বাড়িয়ে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা কাজে আসেনি। বরং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং বাজার মাফিয়ার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত নয়, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থেকে তৈরি হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মাফিয়া গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি, বরং সরকারের অব্যাবস্থাপনায় আরো শক্তিশালী হয়েছে সিন্ডিকেট।”
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান যোগ করেন, “কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে তীব্র করেছে। শুধু আর্থিক নীতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার।”
কৃষি খাতের ধস এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। গ্যাস সংকটে দেশীয় সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জর্ডান থেকে আমদানি ডিএপি সারে নওগাঁসহ বিভিন্ন এলাকায় ফসল নষ্ট হয়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। সময়মতো কীটনাশক, সার না পাওয়ায় উৎপাদন হ্রাস—এসব কারণে খাদ্যপণ্যের দাম চড়া।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৭ মাসে কৃষি ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। এ অবস্থায় রাজস্ব আয় বাড়ছে না, বরং ঘাটতি বাড়ছে। আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিচ্ছে—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ বৃদ্ধি ও সংস্কারে অগ্রগতি না হলে ঋণ খেলাপির ঝুঁকি বাড়বে।
প্রতিবেশী ভারত (০.৭১%), শ্রীলংকা (২.১০%) ও পাকিস্তানে (৫.৬%) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখালেও বাংলাদেশ ব্যর্থ। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এভাবে চললে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে। সরকারের কাছে দাবি উঠেছে দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা মজবুত ও কৃষি সংস্কারের।
