বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় সহিংসতা ও চরমপন্থী হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান জানিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা করেছেন পোপ লিও চতুর্দশ। তিনি নির্যাতিত সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর পাশে দাঁড়াতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ভ্যাটিকান সিটিতে দেওয়া এক বক্তব্যে পোপ বলেন, বাংলাদেশে একাধিক ধর্মীয় নির্যাতনের মুখে পড়েছে সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। জিহাদীরা সংখ্যালঘুদের প্রতি নির্যাতন চালাচ্ছে এবং এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীকে নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
পোপ লিও চতুর্দশ বলেন, বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রণোদিত সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা ও বৈষম্যের ঘটনা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। তিনি বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, এসব অঞ্চলে চরমপন্থী সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং বহু মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে।
বিশ্বনেতা ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে পোপ বলেন, সব ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। শান্তি, ন্যায়বিচার এবং সকল ধর্মাবলম্বীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
নাইজেরিয়ার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে পোপ বলেন, সেখানে চরমপন্থী সহিংসতায় খ্রিস্টান ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিহত হচ্ছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
এ ছাড়া সিরিয়ার দামেস্কসহ বিভিন্ন স্থানে উপাসনালয়ে চালানো সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন পোপ। তিনি এসব হামলাকে মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে নিহত ও আহতদের জন্য প্রার্থনার আহ্বান জানান।
পোপের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর আগে সংখ্যালঘুদের নিয়ে কাজ করা দেশের বৃহত্তম সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, ভোটের আগে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েই চলেছে এবং এতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
সংগঠনটির মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, শুধু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্তত ৫১টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড রয়েছে। এ ছাড়া সংখ্যালঘুদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। নির্যাতন, ধর্ষণের চেষ্টা এবং শারীরিক হামলার মতো গুরুতর অভিযোগের কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
ঐক্য পরিষদের দাবি, নতুন বছরের শুরুতেও সহিংসতা থামেনি। গত ২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলায় এক সংখ্যালঘু কৃষকের ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন শরীয়তপুরে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে এবং তার মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। একই সময়ে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা জেলায় অস্ত্রধারী দুষ্কৃতীদের ডাকাতির ঘটনায় নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ করা হয়েছে।
সংগঠনটি জানায়, ৪ জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলায় একটি গয়নার দোকান থেকে প্রায় ৩০ ভরি সোনা লুট করা হয়। একই দিনে ৪০ বছর বয়সী এক হিন্দু বিধবাকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ওই নারীকে প্রকাশ্যে অপমান ও শারীরিক নিগ্রহ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। পাশাপাশি, এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে চরমপন্থী গোষ্ঠীর চাপের কথাও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
