রাষ্ট্র কি চলছে পর্দার আড়ালে?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পাল্টা শুল্ক সংক্রান্ত বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি, সোমবার ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তিটি ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ করেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে সশরীরে ওয়াশিংটনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ জেমিসন গ্রিয়ার। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ঢাকায় অবস্থান করেই ভার্চুয়ালি চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। বাণিজ্য সচিব ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, উপদেষ্টা ঢাকায় বসেই চুক্তির কপিতে স্বাক্ষর সম্পন্ন করেছেন। সেই স্বাক্ষরিত দলিল নিয়েই ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা, যাতে চূড়ান্ত কার্যকর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়—এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
ওয়াশিংটনগামী প্রতিনিধি দলে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।
৩ ফেব্রুয়ারি জারি করা সরকারি আদেশ অনুযায়ী, প্রতিনিধি দল ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ত্যাগ করবে এবং ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে দেশে ফিরবে। তবে চুক্তি যখন সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হচ্ছে এবং শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও সফরে যাচ্ছেন না, তখন এই বিদেশ সফরের যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ফলে সফরটি ঘিরে অস্বচ্ছতা ও সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও বিভিন্ন মহলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে—সরকারের শেষ সময়ে এটি মূলত দলবদ্ধভাবে বিদেশ সফরের একটি সুযোগ হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, যেখানে মূল স্বাক্ষর প্রক্রিয়া ভার্চুয়ালি সম্পন্ন হচ্ছে, সেখানে এই সফর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ছাড়া আর কিছু নয়।
চুক্তিটি শুরু থেকেই রহস্যে ঘেরা। পূর্ববর্তী বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে ‘গোপন’ বা ‘সিক্রেট’ চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুনে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের কারণে চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামাতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাজারে, বিশেষ করে ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্য সুবিধার প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের পোশাক খাত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ পেতে পারে। তবে আলোচনায় রয়েছে, চুক্তির ভেতরে ডিজিটাল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, কঠোর উৎস বিধি, জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শর্ত, চীন থেকে আমদানি কমানোর চাপ এবং মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, জনসমক্ষে শর্তাবলি প্রকাশ না করে এমন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত বিদেশ সফর সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
