বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে এবং কারাগারের কঠোর নিরাপত্তার মাঝেও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত বছরের আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে এবং পুলিশি হেফাজতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অর্ধ শতাধিক নেতাদের মৃত্যুর ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন আজ ৭ই ফেব্রুয়ারি, শনিবার সকাল ৯টায় অসুস্থ হয়ে মারা যান। জেলা কারাগার থেকে তাকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দিনাজপুর জেলা কারাগারের জেলার ফরহাদ সরকার।
রমেশ চন্দ্র সেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নে ১৯৪০ সালের ৩০শে এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ক্ষিতীন্দ্র মোহন সেন ও মায়ের নাম বালাশ্বরী সেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং ২০০৯-২০১৪ পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
দিনাজপুর কারাগারের জেলার ফরহাদ সরকার বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৭ই আগস্ট রমেশ চন্দ্র সেনকে দিনাজপুর জেলা কারাগারে আনা হয়। আজ সকাল ৯টায় হঠাৎ বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তার মৃত্যুর খবর পাই।’
তবে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মাসুদ রানা।
তিনি বলেন, ‘সকালে রমেশ চন্দ্র সেনকে হাসপাতালে আনা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক অনুপম পাল সকাল ৯টা ২৯ মিনিটে তাকে ব্রট ডেথ (মৃত অবস্থায় আনা হয়) ঘোষণা করেন।’
রমেশ চন্দ্র সেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি পানিসম্পদমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৭ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি উপনির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার পর বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তার স্বাস্থ্যের অবনতি এবং কারাগারে চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়ার বিষয়েও অভিযোগ মিলেছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৬ই আগস্ট তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজ বাড়ি থেকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও জেলা কারাগারে পাঠায়। সেখান থেকে ১৭ই আগস্ট তাকে দিনাজপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তিনি হত্যাসহ মোট ৩টি মামলায় কারাগারে বন্দি ছিলেন।
এর আগে দেশের আলোচ্য ইস্যুতে উঠে এসেছে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন–এর মৃত্যুর ঘটনা, যা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ও মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নূরুল মজিদ ২০২৪ সালের আগস্টে মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন এবং ২০২৫ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক ও ক্ষোভও দেখা যায়। কারা কর্তৃপক্ষের চিকিৎসা ও হেফাজতের দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল যদিও কর্তৃপক্ষ তা নিরসন করতে ব্যস্ত ছিল।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গতকালের মতোই রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি ও নির্বিচারে গ্রেপ্তার, মৃত্যুর মতো ঘটনা দেশকে আরও গভীর চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
প্রসঙ্গত, রমেশ চন্দ্র সেন ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া ইউনিয়নের কশালগাঁও এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন। পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া রমেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও ছিলেন।
২০০৫ সাল ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের কেবিনেট সদস্য এবং একই সাথে তিনি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) এর নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত খাদ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
