জামিনও এখন অপরাধ—ভয়ভীতির রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারের মৃত্যু
দেশের বিচার ব্যবস্থা আজ এক গুরুতর আস্থাহীনতার সংকটে রয়েছে। ইউনুস সরকারের সময়কালে বিচারিক প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের আশ্রয় না হয়ে ক্রমশ ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলার বিস্তার, দীর্ঘ সময় জামিন না পাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রের মৌলিক ন্যায়বিচার কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এফআইআরবিহীন গ্রেপ্তার ও ‘মামলা বাণিজ্য’
অনেকে এমন অভিযোগ তুলেছেন যে, পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার আওতায় এফআইআর ছাড়া গ্রেপ্তার করছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য তথ্য বা সুস্পষ্ট অভিযোগ নেই। পরে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে কার্যত দীর্ঘ সময় বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। এমন ধরনগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বতন্ত্র মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘অ্যার্বিট্রারি অ্যারেস্ট’ বা নির্বিচার গ্রেপ্তার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই ধাঁচে পুলিশ “অজানা” আসামিদের নামে মামলা দায়ের করে বড় সংখ্যক মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে আটক রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
জামিন এখন ‘অপরাধ’
দেশের বিচারিক ব্যবস্থায় জামিন পাওয়াকে ক্রমশ কঠিন করে তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলায় দীর্ঘ সময় ধরে জামিন মিলছে না, যদিও প্রচলিত আইনে জামিন নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত। এই পরিস্থিতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে এবং কারাগারগুলোতে বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
আইনজ্ঞদের মতে, যেখানে বিচারকরা আইন অনুযায়ী জামিনের নির্দেশ দেন, সেখানে তাদের ওপর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ চাপ, বদলি কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর অভিযোগ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিচার বিভাগের ভেতরেও ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পুরো বিচার ব্যবস্থায় পড়ছে।
বিচারককে মব লিঞ্চিং ও ‘ট্যাগিং’
আরও গভীর উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো—কিছু ক্ষেত্রে বিচারক বা আইনের রক্ষকরাও রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’-এর শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয় আরোপ করে জনতার হাতে লাঞ্ছিত করার পর সেই অবস্থাতেই গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া কার্যকর করার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে বিচারকদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক শঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত মব জাস্টিসকে নিরুপায়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই তার মৌলিক অধিকার বাতিল করতে পারে না; কিন্তু বাস্তবে ‘ট্যাগ’ হয়ে গেলে আইনি আশ্রয় পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
বিচারাধীন মামলার পাহাড় ও ন্যায়বিচারের সংকট
বিচার ব্যবস্থার এই সংকটের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে মামলার ভয়াবহ জটে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশের বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে মোট ৪৬,৫২৬০০০ (প্রায় ৪.৬৫ মিলিয়ন) মামলা বিচারাধীন রয়েছে—যা বিচার ব্যবস্থা ও জামিন প্রক্রিয়ার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে বলে আইন উপদেষ্টাও স্বীকার করেছেন।
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী,
সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলেটিভ ডিভিশনে বিচারাধীন মামলা প্রায় ৩৭,০০২টি,
হাইকোর্ট ডিভিশনে প্রায় ৬,১৬,৪৫৩টি,
আর নিম্ন আদালতগুলোতে বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ৩৯,৯৮,৮০৫টি মামলা, যা মোট জটের ৮৬ শতাংশেরও বেশি।
এ ছাড়া শুধু ফ্যামিলি কোর্টেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৭৪,২৫৯টি, যার মধ্যে বহু মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। গত কয়েক বছরে এই জট ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে—২০২৪ সালের শেষ দিকে যেখানে মোট বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ৪৫ লাখ, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বিপুল মামলার ভারে নিম্ন আদালতের প্রায় প্রতিটি বিচারকের ওপর গড়ে দুই হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তির চাপ রয়েছে, যা দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচারকে কার্যত অসম্ভব করে তুলছে। এর ফলেই বিচারাধীন অবস্থায় থাকা হাজারো মানুষ দীর্ঘ সময় জামিন না পেয়ে কারাবন্দি থাকছেন—যা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
সম্প্রতি ব্যবসায়িক নেতা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি একে আজাদ এক বক্তৃতায় বিচার ব্যবস্থা, জামিন সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য সামাজিক ও পেশাজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি হাজারো ভুক্তভোগী নাগরিকের নীরব ক্ষোভ ও আতঙ্কের প্রতিফলন।
বিচারহীনতার রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ সংকট
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে দেশের ভবিষ্যতের ওপর। নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অনিশ্চয়তায় শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণরা দেশের বাইরে সুযোগ খুঁজছেন। তাদের আশঙ্কা—যেখানে নির্দোষ হয়েও গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ সময় জামিন না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে, সেখানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিরাপদ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার ব্যবস্থা যদি ভয় ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই নড়ে যায়। ন্যায়বিচার ছাড়া আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বর্তমান বাস্তবতায় জরুরি ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, পুলিশের জবাবদিহি এবং জামিন ব্যবস্থার মানবিক ও সাংবিধানিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই সময়কাল ইতিহাসে বিচারহীনতা, নিপীড়ন এবং নাগরিক অধিকারের এক গভীর সংকটের অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
