মৃন্ময় সেন
১৯৭১ সালের আজকের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে উড়েছিল সোনালি মানচিত্রখচিত পতাকা, যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সবুজ জমিনের ওপর লাল বৃত্তের মাঝে সোনালি মানচিত্রখচিত এই পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন ডাকসুর আ স ম আবদুর রব।
সেই মুহূর্তটি ছিল প্রতীকী, কিন্তু তার অভিঘাত ছিল গভীর। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছিল এই পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। এদিন ঢাকার রাজপথে নেমেছিলেন হাজারো মানুষ। দলমত নির্বিশেষে নাগরিকরা জানান দিয়েছিল; বাঙালি আর মাথা নত করবে না। ছাত্র-জনতার অকুতোভয় মনোবল তখন স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়।
পটভূমিতে ছিল ছাত্রসমাজের সংগঠিত প্রস্তুতি। ১ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সিদ্ধান্ত হয় ২ মার্চ গণসমাবেশে স্বাধীনতার পতাকা উড়বে। সভাপতিত্ব করেন নূরে আলম সিদ্দিকী। পাশে ছিলেন শাজাহান সিরাজসহ অন্য নেতারা। লাখো মানুষের সামনে ঘোষণা করা হয়, এটাই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। জনতার করতালি সেই ঘোষণাকে গণসমর্থনে রূপ দেয়।
৩ মার্চ পল্টনে ইশতেহার পাঠের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপরেখা স্পষ্ট হয়। সেখানে ‘বাংলাদেশ’ নাম, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং জাতীয় সংগীত হিসেবে আমার সোনার বাংলা গ্রহণের কথা ঘোষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সেই অঙ্গীকারকে চূড়ান্ত সংগ্রামের দিকে ঠেলে দেয়।
২৩ মার্চ ঢাকাজুড়ে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়। ধানমণ্ডি ৩২-এ গিয়ে সেই পতাকা তুলে দেওয়া হয় শেখ মুজিবুর রহমান–এর হাতে। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর-এ প্রবাসী সরকারের শপথেও একই পতাকা উড়ে। মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে শহিদদের দেহে জড়িয়ে, আর ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে, এই পতাকাই হয়ে ওঠে জাতির পরিচয়।
স্বাধীনতার পর পতাকার নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। লাল বৃত্তের ভেতর থেকে মানচিত্র সরিয়ে বর্তমান রূপ দেওয়া হয় শিল্পী কামরুল হাসান–এর পরামর্শে। সেই পরিমার্জিত নকশাই আজকের জাতীয় পতাকা।
২ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়। এদিনটি ছিল উপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতীকী চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ। একটি পতাকা উড়েছিল, আর তার সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছিল একটি রাষ্ট্রের অনিবার্য জন্ম।
