হঠাৎ পাশার দান উল্টালো। ইরান মার খেতে খেতে সেই জায়গায় আঘাত করলো যাকে বলা যেতে পারে মার্কিন অ্যাকিলিস হিল। ইরান ইসরায়েল যুদ্ধের সপ্তম দিনের মাথায় এসে এ যেন এক নতুন মোড়। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের অনবরত মিসাইল হামলার মুখে পড়ে এক নীরব নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী আরব রাষ্ট্রগুলো। এতদিন ধরে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলো যুক্তরাষ্ট্রে। এমনকি আরও ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ছিলো গাল্ফ দেশগুলোর তরফে। তবে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে যুদ্ধের সপ্তম দিনে এসে।
ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ভূমি থেকে আমেরিকার সেনা ছাউনি, দূতাবাস ও ইসরায়েলের মোসাদকে কোনো রকমের সহযোগিতা করা যাবে না। করলে ইরান তার হামলা অব্যাহত রাখবে। এমন হুমকির পর আরব শেখরা প্রথমে তা পাত্তা না দিলেও এখন নড়েচড়ে বসেছে। কারণ ইরানের হাতে থাকা দুইটি চাবিকাঠি তারা খুব সুন্দর এবং যথাযথভাবে ব্যবহার করছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।
প্রথমত, অনবরত মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির চালিকাশক্তি জ্বালানি রপ্তানি পথের চোখ পয়েন্ট হরমুজ প্রণালী আটকে দিয়েছে ইরান। বর্তমানে হরমুজে ইরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আর এর ফলাফলে আরব দেশগুলোর অর্থনীতির পারদে নিম্নগামী চাপ স্পষ্ট হয়েছে।
ইরান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়তে থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস। প্রসঙ্গগত, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে সৌদি আরবের ১৪৫ বিলিয়ন, আরব আমিরাতের ১০০ বিলিয়ন, কুয়েতের ৫১ বিলিয়ন এবং কাতারের অন্তত ৭.৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এছাড়া আগামী দশ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, যা এখন হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর মধ্যে কেবল সৌদি আরবেরই এক ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ সময় শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর হামলার পর সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতি উপসাগরীয় দেশগুলোর বাজেটের ওপর অস্বাভাবিক চাপ বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপসাগরীয় কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, যুদ্ধ অর্থনীতির চাপ সামলাতে আরব রাষ্ট্রগুলো এখনো প্রস্তুত নয়। তাই তারা বিদেশে করা বিনিয়োগ, চুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা শুরু করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উত্থান দুটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের মাঝেও দ্রুত বিকাশমান শহরগুলোকে নিরাপদ বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি রপ্তানি থেকে ধারাবাহিকভাবে বিপুল আয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এই দুইটি ভিত্তিকেই একসঙ্গে নাড়া দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা করছে বর্তমান মার্কিন চুক্তিগুলোতে ‘মেজর ফোর্স’ ধারা প্রয়োগ করা যায় কিনা। একইসাথে তারা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিগুলোও পুনর্মূল্যায়ন করতে যাচ্ছে, যাতে যুদ্ধজনিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা হলেও লাঘব করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয় বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈশ্বিক বিনিয়োগ কৌশল ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
