ইব্রাহিম চৌধুরী
৮ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হলো, মনে হয়েছিল অন্তত কিছুটা স্থিরতা আসবে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টাও পেরোয়নি — বুধবার বিকেলের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেল, এই যুদ্ধবিরতি আসলে কতটা ভঙ্গুর মাটির উপর দাঁড়িয়ে। ইরান পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়তে থাকল, ইসরায়েল লেবাননে একের পর এক বিমান হামলা চালাল, এবং ইরান আবার হুমকি দিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার। যুদ্ধবিরতির চুক্তি এখনও কাগজে আছে — কিন্তু বাস্তবে তার অস্তিত্ব প্রতি মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই মুহূর্তে চারটি বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে — যার উত্তরের উপর নির্ভর করছে ইসলামাবাদের আলোচনার ভবিষ্যৎ।
প্রশ্ন এক: লেবানন কি এই চুক্তিকে ভেঙে দেবে?
বুধবার লেবাননে ইসরায়েল তার সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালাল — দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে ডজন ডজন বিমান আঘাত হানল, রাজধানী বেইরুটেও হামলা হলো, নিহত হলেন ২৫৪ জন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্স-এ পোস্ট করে সরাসরি বললেন, “ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত স্পষ্ট — আমেরিকাকে বেছে নিতে হবে, যুদ্ধবিরতি নাকি ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। দুটো একসাথে হবে না।” ইরানের ১০-দফা প্রস্তাবে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের দাবি ছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছিলেন, চুক্তিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলছেন উল্টো কথা। এই সরাসরি দ্বন্দ্বই এই মুহূর্তে পুরো চুক্তির সবচেয়ে বড় বিপদ।
প্রশ্ন দুই: হরমুজ কি আদৌ খুলবে?
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বুধবার পেন্টাগনে বললেন, প্রণালি খোলা আছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই ইরান আবার সেটি বন্ধ করে দিল — লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি লেভিট বললেন, প্রণালি বন্ধের খবর “মিথ্যা।” কিন্তু সামুদ্রিক যান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, সারা বুধবার মাত্র তিনটি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে — যেখানে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি জাহাজ যাতায়াত করত। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে ইরানের নতুন দাবি — প্রণালি দিয়ে যাওয়া প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য এক ডলার “টোল” আদায় করতে চায় তেহরান, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। আর ট্রাম্প নিজেই বলছেন ইরানের সাথে “জয়েন্ট ভেঞ্চার” করে প্রণালি পরিচালনার কথা ভাবছেন — যে প্রণালির উপর নিয়ন্ত্রণ নিতেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
প্রশ্ন তিন: ইরানের সেনাবাহিনী কি আদেশ মানছে?
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত — চারটি উপসাগরীয় দেশ বুধবার নতুন ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বেশ কিছু ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। কুয়েতে তেল স্থাপনা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে ড্রোন হামলা হয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, নয়টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। হেগসেথের ব্যাখ্যা অদ্ভুত — তিনি বলেছেন, আমেরিকা ইরানের সামরিক কমান্ড কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে, তাই মাঠে থাকা সেনারা হয়তো এখনও যুদ্ধবিরতির খবর পাননি। তিনি বললেন, “ইরান যেন তার দূরদূরান্তের সৈন্যদের কাছে কবুতর পাঠিয়ে জানিয়ে দেয় — আর গুলি করো না।” অন্যদিকে ইরানের সিনিয়র কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি এক্স-এ পোস্ট করেছেন, “রাষ্ট্রের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর হাত ট্রিগারে থাকবে।”
প্রশ্ন চার: পারমাণবিক ইউরেনিয়াম কে পাবে?
এটাই হয়তো সবচেয়ে বিস্ফোরক প্রশ্ন। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরানে আর কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হবে না এবং মাটির নিচে পুঁতে রাখা পারমাণবিক “ধুলো” খুঁড়ে বের করতে আমেরিকা ইরানের সাথে কাজ করবে। হেগসেথ দাবি করছেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরানের পারমাণবিক উপকরণ সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু ইরান এখনও এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে এই মুহূর্তে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড অতি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে — যা দিয়ে একাধিক পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। এই ইউরেনিয়াম কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, কে নিশ্চিত করবে — এর কোনো উত্তর এখনও নেই।
এই চারটি প্রশ্নের উত্তর না মিললে ইসলামাবাদে বসা আলোচনা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে। ১০ এপ্রিল যখন ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে পৌঁছাবেন, তখন তাদের সামনে থাকবে এই চারটি পাহাড়সম সমস্যা। লেবানন, হরমুজ, বিদ্রোহী সেনা আর পারমাণবিক ইউরেনিয়াম — এর যেকোনো একটিই যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর এই মুহূর্তে চারটিই একসাথে টগবগ করে ফুটছে।
