ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের শেষভাগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদিত ৩৭টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে দেয়। এসব প্রকল্প মূলত ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’-এর আওতায় বিনা দরপত্রে (unsolicited) অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য
সংখ্যা: অন্তত ৩৭টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প (কয়েকটি উইন্ড ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য সহ)।
মোট উৎপাদন ক্ষমতা: প্রায় ৫,৬৮১ মেগাওয়াট।
বিনিয়োগের পরিমাণ: প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৭২,০০০ কোটি টাকারও বেশি)
এইসব প্রকল্পগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও প্রস্তবনা ছিল চীন। সিঙ্গাপুরসহ ১৪-১৫টি দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পগুলো গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল।
যে সকল এলাকায় স্থান নির্ধারিত হয়েছিলঃ
কক্সবাজার: Joules Power Limited-এর ৫০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্প (Cox’s Bazar 50 MW Solar Project)
টাঙ্গাইল: Basil Tangail ১০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্প (Renewable Energy UK Portfolio Limited-সহ কনসোর্টিয়াম)
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী জেলা): Goalondo ১০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্প (China Datang Overseas Investment Company Limited-সহ)
ময়মনসিংহ: Mymensingh ১০০ মেগাওয়াট সৌর প্রকল্প (Cassiopea Fashion Limited-সহ কনসোর্টিয়াম)
এছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাঙ্গুনিয়া ইত্যাদি এলাকায় বড় আকারের প্রকল্প ছিল। পাবনা জেলায় (সুজানগর, হেমায়েতপুরসহ) একাধিক প্রকল্প। ঢাকা ও আশেপাশের জেলায় গোয়ালন্দ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী এবং উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জসহ চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ছিল।
অনেকগুলো প্রকল্পে লেটার অব ইনটেন্ট (LOI) দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটিতে জমি অধিগ্রহণ, প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে ছিল।
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ অন্তত ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারত বলে অনুমান করা হয়।
বাতিলের কারণ ও ফলাফল
অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তি ছিল, এসব প্রকল্প দরপত্র ছাড়া অনুমোদিত হয়েছিল এবং তাতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করে ইউনূসের সরকার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ বাতিল করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এরপর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়ে জানায় যে, বাতিল আইনের আওতায় শুরু হওয়া প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে না।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতি ও আস্থাহীনতা
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত এই প্রকল্প বাতিলের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক কোম্পানি আওয়ামী লীগ আমলে লেটার অব ইনটেন্ট (LOI) পাওয়ার পর জমি ক্রয়, সম্ভাব্যতা যাচাই (feasibility study), পরিবেশগত ছাড়পত্র, প্রাথমিক নকশা প্রণয়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজে কয়েকশ কোটি টাকা (প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি) ব্যয় করেছিলেন।
প্রকল্পগুলো বাতিল হওয়ায় এসব অর্থ প্রায় পুরোপুরি অপচয় হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা শুধু আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীনই হননি, বরং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, সময় ও শ্রমও নষ্ট হয়েছে। অনেক বিদেশি কোম্পানি (বিশেষ করে চীন, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশের) এই প্রকল্পগুলোতে যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল, যার মোট সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) স্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, এই হঠাৎ ও একতরফা বাতিলের সিদ্ধান্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা গভীরভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। অনেক বিনিয়োগকারী এখন বাংলাদেশকে “নীতি-অস্থিরতা” ও “অপ্রত্যাশিত ঝুঁকি”-এর দেশ হিসেবে দেখছেন। ফলে তারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং নতুন করে বড় আকারের বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যেসব প্রকল্প ২০২৫-২০২৬ সালের মধ্যে চালু হলে জাতীয় গ্রিডে হাজারেরও বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতে পারত এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ অনেকাংশে কমে যেতো। সেগুলো বাতিল হওয়ায় দেশ এখন বিদ্যুৎ সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সার্বিকভাবে, এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত শুধু বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতি ও আস্থাহানির কারণ হয়নি, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)সহ বিশেষজ্ঞরা বাতিলকৃত প্রকল্পগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেক বিনিয়োগকারী আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন। পরবর্তীতে কয়েকটি প্রকল্প পুনরায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম কমানো সম্ভব হয়েছে বলে সরকারি পক্ষ দাবি করেছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই বাতিলের ফলে দেশের বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিলম্বিত হয়েছে।
