ক্রিপ্টো মানেই অদৃশ্য নয় : ইউনুসের ঘনিষ্ঠজন সাবেক শিশু উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক যেভাবে হাতেনাতে ধরা সম্ভব
ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে এত বিপুল পরিমানের টাকা কি আসলেই পাচার করা সত্যিই সম্ভব? আসিফ মাহমুদ সাজীব ভূঁইয়ার নামে দুদকে জমা পড়া অভিযোগের তালিকায় যখন দুবাই, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া আর পর্তুগালের নাম উঠে এসেছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্নটা জাগা খুব স্বাভাবিক। উত্তরটা হলো, হ্যাঁ সম্ভব। এবং দুঃখজনকভাবে এটি এতটাই সহজ যে বিএনপির তারেক রহমান হোক বা গ্রামীণ ব্যাংকের ড. ইউনুস, সবার পাচার নেটওয়ার্ক প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। মজার ব্যাপার হলো, ইউনুস তো এখন আর ক্ষমতায় নেই, আসিফও নেই। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে বিএনপি ক্ষমতায়। কিন্তু যাদের নামে এসব অভিযোগ, তাদের ছায়া নেটওয়ার্ক ততদিনে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দুবাই আর লিসবনের লাক্সারি ভিলায় শিকড় গেড়ে বসেছে।
ব্যাংকের সুইফট চ্যানেল দরকার নেই। বিকাশ, নগদ আর রকেটের এজেন্টদের ক্যাশ টেবিল থেকে পিটুপি (P2P) মেকানিজমে টাকা সরাসরি অন-চেইন ক্রিপ্টোতে রূপান্তর করা যায়। সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ইউএসডিটি বা টেদার। এর মূল্য এক ডলারের কাছাকাছি স্থির থাকে, তাই পাচারকারীদের হিসাব মেলাতে কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। দুবাইয়ে শত শত বৈধ-অবৈধ ওটিসি (Over-The-Counter) ডেস্ক আর রিয়েল এস্টেট এজেন্সি বসে আছে। সেখানে টাকা জমা দিলে সাথে সাথে সোনার পাথরবাটি। বিলাসবহুল ভিলা, প্রপার্টি, এমনকি নগদ দিরহাম-ডলারও ক্লিয়ার হয়ে যায়। পর্তুগাল বা ইউরোপের গোল্ডেন ভিসার দালালরা তৃতীয় পক্ষের সেল কোম্পানি খাড়া করে ক্রিপ্টো সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করে দেয়। কাগজে কলমে সব বৈধ, কিন্তু পেছনে টাকার উৎস গায়েব।
অপরাধীরা ভাবে ক্রিপ্টো মানে এনক্রিপ্টেড, তাই ধরা পড়ার ভয় নেই। এটা তাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। ব্লকচেইনের পাবলিক লেজারে প্রতিটি লেনদেন চিরকালের জন্য খোদাই করা থাকে। চেইনালাইসিস, এলিপটিক, সাইফারট্রেসের মতো ফরেনসিক সফটওয়্যার একটি ওয়ালেট অ্যাড্রেস পেলেই পুরো ফান্ড ফ্লো ম্যাপ বের করে ফেলে। কোন ট্রানজিট ওয়ালেট থেকে টাকা কোন এক্সচেঞ্জে গেল, কোথায় ক্যাশ আউট হলো, সব ট্রেইল ধরা পড়ে। ক্রিপ্টো যতক্ষণ ডিজিটাল ওয়ালেটে থাকে ততক্ষণ নাম গোপন থাকে। কিন্তু যেই না দুবাই, সিঙ্গাপুর বা পর্তুগালের কোনো কাস্টডিয়াল এক্সচেঞ্জে তা ডলার বা ইউরোতে রূপান্তর করা হলো, অমনি কেওয়াইসি (Know Your Customer) তথ্যের মুখোমুখি হতে হয়। এখানেই পাচারকারীদের সবচেয়ে বড় আইনি ফাটল।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) যদি দুবাইয়ের এফআইইউ, সুইজারল্যান্ডের এমআরওএস বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানি লন্ডারিং ট্র্যাকিং সংস্থার সাথে সরাসরি তথ্য বিনিময় করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলো সেই তথ্য দিতে বাধ্য থাকে। পিটুপি মার্চেন্ট ও ওটিসি দালালদের গ্রেপ্তার করলে তাদের টেলিগ্রাম চ্যাট হিস্ট্রি আর মোবাইল ফরেনসিক থেকে ব্যাকঅফিস কন্ট্রোলারদের মেক অ্যাড্রেস পর্যন্ত বেরিয়ে আসে। দুদক ইতিমধ্যে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) আর ব্লকচেইন ফোরেনসিকের সহায়তা নিলে, ভিপিএন বা ভুয়া নাম যতই ব্যবহার করা হোক, ফিয়াট-টু-ক্রিপ্টো অন/অফ র্যাম্প পয়েন্টগুলোই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
আর এখানেই আসল চিত্রটা স্পষ্ট হয়। আসিফ মাহমুদের মতো প্রভাবশালীদের হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাশ একদিনে গায়েব হয় না। এর একটি অংশ ক্রিপ্টো আর হুন্ডি চেইনে পাচার হলেও বিশাল একটি অংশ দেশের ভেতরেই ছায়া অর্থনীতিতে (Shadow Economy) ঘুরপাক খায়। রিয়েল এস্টেট ও জমি কেনায় দলিলে কম দাম দেখিয়ে বাকি কোটি কোটি টাকা প্রক্সিদের মাধ্যমে টেবিলের নিচ দিয়ে নগদ পরিশোধ করা হয়। ইটভাটা, ট্রান্সপোর্ট, রিসোর্ট কনস্ট্রাকশনের মতো নগদ লেনদেনের ব্যবসায় ঢুকিয়ে প্রতিদিনের আয় হিসেবে ধীরে ধীরে সাদা করা হয়। দেশীয় আন্ডারগ্রাউন্ড পিটুপি মার্চেন্টদের ক্যাশ পুল বা হুন্ডি রিজার্ভ হিসেবে এই টাকা জমা থাকে। কোনো সাধারণ গ্রাহক যখন বিকাশে টাকা দিয়ে ইউএসডিটি কিনতে চায়, দালালরা এই নগদ ক্যাশ দিয়েই লেনদেন ক্লিয়ার করে। প্রক্সি সামলানো, আইনি লড়াইয়ের খরচ, প্রভাব বজায় রাখতে অনুগত কর্মকর্তাদের মুখ বন্ধ রাখা, সবখানেই এই নগদ টাকা লাগে। কারণ নগদ টাকার কোনো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থাকে না।
দুর্নীতি বা পাচারের কথা উঠলেই আমরা দুবাই-সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকের কথা ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লুণ্ঠিত কোটি কোটি টাকার এক বিশাল অংশ আমাদের দেশের ভেতরেই ছায়া অর্থনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্থানীয় পিটুপি মার্চেন্ট আর গোপন ওটিসি দালালরাই এই আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং মার্কেটের ফিজিক্যাল এন্ট্রি গেট। এদের ফোরেনসিক নজরদারিতে আনলে, তাদের লেনদেনের ডিজিটাল ট্রেইল অডিট করলে, এপার থেকে ওপারে কোটি কোটি ডলার পাচারের মূল হোতা আর প্রক্সি নেটওয়ার্কের আসল পরিচয় বেরিয়ে আসবে। প্রশ্ন শুধু একটাই, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায় থাকা নতুন সরকার সেই সাহস দেখাবে কি না, নাকি এই ছায়া নেটওয়ার্কের সুতো ধরতে গিয়ে নিজেরাই জড়িয়ে পড়বে সেই একই ফাঁদে?
