আফজাল হোসেন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বনলতা সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করা হয়েছে। জেনেছি বন্ধ করেছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা। আমরা অনেকেই মনে করে সন্তুস্ট হই দেশে একটা উদারনৈতিক সমাজব্যবস্থা আছে। এদেশে নানা ধর্মের মানুষ, নানাধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। যে কোনো বিষয় নিয়ে যে কেউই শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে।
শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহন করুক, শিক্ষাদান করার, সমাজ পরিবর্তন করার জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠুক। তার আগেই অমুকটা চলতে পারবে না, এটা করা, বলা যাবে না এমন শাষক হয়ে ওঠার ইচ্ছা জাগা বিপদজনক। চাউল পানি দিয়ে চুলায় চড়িয়ে দিলে ভাত রান্না হয়। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুলার উপরে রাখা নিয়ম। সিদ্ধ হওয়ার আগে নামিয়ে ফেললে তা ভাত হয় না। খাওয়ার অনুপযুক্ত থাকে।
মানুষও চাইলে ফট করে দায়িত্ববান মানুষে পরিণত হয় না। গাছে পেয়ারা, আম ফললেই তা পরিণত আম বা পেয়ারা নয়। পরিণত হতে সময় লাগে। সময়ের আগেই পরিণত হওয়ার ভাব দেখালে মানুষ রহস্য করে বলে অকালপক্ক।
একটা ভালো মানুষ ভালো কাজের মধ্য দিয়ে নিজের ভালোমানুষি প্রকাশ করে। জনে জনে কলার ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলে না, দেখো আমি ভালো মানুষ। ভালো ছাড়া আমি দেখিনা, ভালো কথা ছাড়া শুনি না। ভালো কাজের পক্ষে থাকি আমি। এরকম বলে ভালো বনে যেতে পারলে দুনিয়া কেমন ভালোয় ভরা থাকতো। ভালো কি তা বুঝতে হয়, মুখে বলে, ভালোর নামে মন্দ করে ভালোর প্রতিষ্ঠা হয় না।
সৃষ্টিকর্তা মানুষকে অসীম শক্তি দিয়েছেন। মানুষ নিজ জ্ঞান অনুযায়ী বুঝে নেয়, তার কিসে শক্তি। জ্ঞানে খাটো ও মনে দুর্বল মানুষ মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়, গায়ের জোর খাটিয়ে বোঝাতে চায়, আমি উচিৎ কাজ করছি। শিক্ষা থাকলে মানুষ বিনয়ী হয়, কিছু করার আগে বিস্তর ভেবে নেয়। তারা গায়ের জোর খাটানোর কথা ভাবেই না। যদি জ্ঞান থাকে জ্ঞানের জোরেই মন্দ, অসুন্দরকে পরাজিত করা উচিৎ বিবেচনা করে।
যে মেয়েটি অদম্য সাহস নিয়ে হাজার হাজার পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে এভারেস্টের চুড়ায় গিয়ে পৌঁছালো, তাকে শুধু নারীই ভাবা হলে বাহবা দেয়া হয় না! ভাবা উচিৎ সে অসীম সাহসী ও শক্তির একজন অসাধারণ মানুষ। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা এমন মানুষকে অসাধারণ স্বীকার করতে রাজি হবে না।
মানুষ ও সমগ্র পৃথিবীর যিনি সৃষ্টিকর্তা তিনি কাউকে কম কাউকে বেশি দিয়ে সৃষ্টি করেননি। কেউ জনমভর সৃষ্টিকর্তাকে বোঝার, অনুভবের চেষ্টা করে, কেউ সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া শক্তির চর্চা, অনুশীলন করে আনন্দে বাঁচে। মানুষের আনন্দ, শান্তি নষ্ট হয় যখন কোনো মানুষ অযথাই ন্যায়ের অজুহাত দেখিয়ে অন্যায় করে।
সৃষ্টিকর্তা এ জগতকে এক মত, এক পথের করে বানাননি। কতরকমের গাছ, পাখি, ফুল, লতাপাতা। কতরকমের বর্ণ, গন্ধ। এ সবই অনুভব করে কিছু না কিছু শেখার জন্য। মানুষ সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষকে সাহসী হওয়া, সাফল্য অর্জন করার শক্তি তিনিই দিয়েছেন। কেন তিনি ব্যর্থতা দান করেন, কেনো দেন সাফল্য- এমন জিজ্ঞাসা ও তার উত্তর বহু প্রাণে থাকে না।
যোগ্য মানুষকে বোঝার ক্ষমতা দিয়ে তিনি যোগ্য বানান। সকল মানুষকে সে ক্ষমতা দেয়া হয়নি। সৃষ্টিকর্তা মানুষের সাথে সাথে শয়তানকেও সৃষ্টি করেছেন। না করলেও পারতেন কিন্তু তিনি মনে করেছেন, শুধু ভালোয় দুনিয়া ভালো চলবে না। ভালোর সাথে মন্দের ঠোকাঠুকি থাকতে হবে। এই ঠোকাঠুকি থাকলে মানুষ ঠিক থাকবে।
সৃষ্টিকর্তার এই রহস্যপ্রিয়তায় জগতজুড়ে মানুষেরা ঠোকাঠুকিতে নিত্য ব্যস্ত। ঠোকাঠুকির বিষয় বেছে নেয় মানুষ। তাতে সংকট তৈরি হয়, সংকটের মুখোমুখি হয়ে মানুষেরা সময়, অবস্থান, দায়িত্ব কর্তব্য বুঝে নেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সংকট তৈরি করা হয়েছে। এখন মানুষের দায়িত্ব ঠিক বা ভুল বুঝে নেয়া।
এই দেশের একটা শ্রেণীর মানুষদের সমস্ত ক্ষোভ, বিদ্রোহ, বিদ্বেষ একমাত্র সংস্কৃতিরই বিরুদ্ধে। সংস্কৃতি ও ধর্ম পাশাপাশি চলতে দিলে নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, এমনই একটা শংকা বোধহয় রয়েছে তাদের মনে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা মনের গভীরতা, উদারতা বাড়িয়ে দেয়। সে উদারতা, গভীরতাকেই হয়তো তাদের ভয়।
বনলতা এক্সপ্রেস জীবনকে বোঝার সিনেমা, নতুন ভাবনায় সমৃদ্ধ হওয়ার সিনেমা। এ সিনেমাটা শুধু বিনোদনের জন্য তৈরি করা হয়নি। সমাজ ও মানুষের ভালো হবে এমন বিশ্বাস ও দায়িত্ব নিয়ে নির্মান করা হয়েছে। যত ভালো যুক্তিই দেয়া হোক, চোখ থাকিতে অন্ধ যারা, তাদের চোখ, মন ও কানে কোনো ভালোই পৌঁছাবে না।
মানুষ যদি ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায় নিজের নিয়ম বানায়, সে নিয়মে চলতে বলতে অন্যকে বাধ্য করে তাহলে সভ্যতা টিকে থাকে না। কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ, মানুষ নিজের রুচি শিক্ষা অনুযায়ী ঠিক করে নেয়। ভুল হয় মানুষের, সে ভুল করেই চিনতে পারে কোনটা ঠিক এবং কেনো ঠিক।
এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ অধিকার হারাবে, হারাবে সুস্থতা। যে কোনো মানুষের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা থাকে বলে সংসার ঠিক থাকে, প্রতিষ্ঠান ঠিক থাকে। সমাজে শান্তি টিকে থাকে।
এমন সংসার আছে যেখানে ছেলে বাবার কথা শোনে না, স্বামী স্ত্রীকে সম্মান মর্যাদা দেয় না। সবারই জানা এমন সংসার হয় খুব অশান্তির, হয় ছিন্নভিন্ন সংসার। প্রেম, শান্তি তেমন সংসারে গিয়ে কোনদিনও আসন পেতে বসতে যায় না।
যারা বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী বন্ধ করতে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে গেছে তারা এই দেশের খায় পরে, এই দেশেই জন্ম দাবী করে। তারা কি সরকারকে অস্বীকার করছে না! প্রচলিত নিয়ম কানুনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতেই এমন সিদ্ধান্ত- মোটেও ন্যায় নয়।
একটা দেশে এইরকম স্বেচ্ছাচারিতা চলতে দিলে সাধারণ মানুষের জীবন পর্যুদস্ত হয়, বাড়ে মানুষের নিরাপত্তাহীনতা। দেশ, স্বাধীনতা, মানুষের সকল প্রকার অধিকার বিপন্ন হয়। দেশটা স্বাধীন হয়েছিল স্বাধীনতা উপলব্ধি করে উপভোগের জন্য। পরাধীনতার জং ধরা শিকল নতুন করে পরার জন্য নয়।
লেখক: চলচ্চিত্র শিল্পী।
