ফারজানা সিদ্দিকা
শহরের এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় বাসা বদল করে আসার পরে ছয়মাসেও আমার মন সুস্থির হয়নি… প্রায়ই হেঁটে হেঁটে পুরোনো পাড়ায় যাই, পরিচিত দোকানদারদের সঙ্গে দুচার কথা বলি, পরিচিত গাছটা দেখি, এমনকি ও পাড়ার ডাস্টবিনের গন্ধটাও ভালো লাগে!
আমি তো ভাড়াটিয়া আজও, তাতেই আমার এ দশা!
এখন বুঝি, কেন আমার আম্মা আর শাশুড়িমাকে আমাদের কাছে বেশিদিনের জন্য এনে রাখা যায় না!! ঠিক একই কারণে, এ বয়সে আমি বিদেশে স্থায়ী হবার কথা ভাবতে পারি না।
প্রশান্ত আর আমার দুজনের সংসারে ২০২২ সাল থেকেই কোনো পারমানেন্ট সহকারী নেই। ছেলে বিদেশে চলে যাবার পর আমাদের জীবনযাপনের ধরণ কিছুটা বদলে গেছে। ফলে, একজন ছুটা সহকারী আসেন কয়েক ঘণ্টার জন্য… আমাদের দিব্যি কাজ চলে যায়।
# আম্মা আর শাশুড়িমা এলে আমরা দুজনই পালা করে কর্মক্ষেত্রে যাই। কিংবা পুরোনো কোনো সহকারীকে অনুরোধ করে কয়েকদিন এসে থাকতে বলি। দুজন বয়স্ক মানুষকে খালি বাসায় রেখে যেতে ভয় লাগে! যদি বাথরুমে পড়ে যান, যদি গ্যাসের চুলোয় কিছু করতে যান, যদি গলায় ওষুধ আটকে যায়!
# এদেশে বাচ্চাদের জন্য, বুড়োদের জন্য পার্মানেন্ট সহকারী পাওয়া সহজ??
# কেয়ার গিভার নামে একটি সেবা চালু হয়েছে। ব্যয়বহুল। তবু কি ভরসা করতে পারবেন?
# আপনার টাকা আছে কিন্তু দেশে এসে বা বাড়িতে গিয়ে মাবাবার কাছে থেকে যাবার উপায় নেই, চাকরি তো করতেই হবে, জীবন চলবে কী করে! তো, বলুন তো, যথেষ্ট টাকা দিয়েও কি মাবাবার জন্য “উপযুক্ত” কোনো সহকারী পাবেন এদেশে? উপযুক্ত বললাম, কারণ এদেশের ৯৮% সহকারীরা ট্রেইন্ড থাকে না।
# ধরা যাক, আপনার স্বামী নেই, সন্তানরা দূরে দূরে চাকরি করে। আপনি অসুস্থ বোধ করলেন। আপনার টাকাও যথেষ্ট আছে। আপনি একা একা এদেশে চিকিৎসা করাতে পারবেন? আপনি সুস্থ মস্তিষ্কে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিজেই ভর্তি হলেন, তারপর? টাকার ব্যাগ পাহারা দেবেন নাকি ওষুধের ঘোরে ঘুম থেকে উঠে দেখবেন সব খালি!!
# ঢাকা ও বড় বড় শহরে আত্মীয়স্বজনরা যে এখন একসাথে বাড়ি বানায়, এক জমিতে ওঠা বাড়ির বিভিন্ন ফ্ল্যাটে থাকে… কেন??
এসব বাড়ি মূলত একেকটা কেয়ার হোম।
# এদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে নেতিবাচক করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন গায়ক নচিকেতা। অথচ বৃদ্ধাশ্রম একটি জরুরি প্রতিষ্ঠান। আপনি জন্মনিয়ন্ত্রণ করে এক বা দুই বাচ্চা জন্ম দেবেন, তাদের ক্যারিয়ার চাইবেন অথচ বৃদ্ধাশ্রমকে সমর্থন করবেন না, এ তো হতে পারে না।
আমি বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষে। একসাথে অনেক বৃদ্ধ থাকবেন। তাঁদের সুষম খাবার দেয়া হবে সারাদিনে চারবেলা। সময় মতো ওষুধ দেবে, প্রেশার ডায়বেটিস মাপা হবে। পেপার পড়বেন। টেলিভিশন দেখবেন। প্রার্থনা করবেন।লুডু খেলবেন। তারপর মশারি টানিয়ে লাইট অফ করে দেবে কেউ।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে বড় বড় মডেল মসজিদ বানিয়েছিলেন। সেরকম বড় বড় বৃদ্ধাশ্রম হোক এদেশে।
একটি মানবিক রাষ্ট্রে জন্ম হোক শিশুদের, মৃত্যু হোক বৃদ্ধদের!
লেখক: প্রফেসর, বাংলাবিভাগ,শাবি সিলেট।
