অনিন্দ্য জয়
বাংলাদেশের ইতিহাসে যদি কেউ বলে, “আমেরিকা বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু”, তাহলে সে হয় ইতিহাস জানে না, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ধান্দাবাজি, ভণ্ডামি ও নোংরামি করছে। আমেরিকা কখনোই মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু নয়, পাকিস্তান ও পাকিস্তানপন্থী রাজাকারদের পরীক্ষিত বন্ধু।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিলো শুধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; এটি ছিলো তাদের আন্তর্জাতিক মিত্রদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম। সেই মিত্রদের অন্যতম ছিলো আমেরিকা। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিচ্ছিলো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা চালাচ্ছিলো। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ছিলো। লাখো নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছিলো। কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছিলো।
সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকা কার পাশে দাঁড়িয়েছিলো? বাংলাদেশের পাশে নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে নয়, গণহত্যার শিকার বাঙালিদের পাশেও নয়, তারা দাঁড়িয়েছিলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পাশে। কারণ তাদের কাছে বাঙালির জীবন নয়, ভূরাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। পাকিস্তান ছিলো তাদের কৌশলগত মিত্র। তাই গণহত্যার খবর জেনেও তারা পাকিস্তানের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি।
২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার পরও আমেরিকা পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পাশে দাঁড়ায়। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখেছিলেন। লক্ষ লক্ষ নিরীহ বাঙালির জীবন তাদের কাছে ভূরাজনীতির চেয়ে বেশি মূল্য পায়নি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাড গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ঐতিহাসিক ব্লাড টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। তিনি নিজের সরকারের নীতির বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকা মানবতার আহ্বান নয়, পাকিস্তানের স্বার্থকেই বেছে নিয়েছিলো।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত, তখন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয় আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের অংশ Task Force 74। এটি ছিলো পাকিস্তানকে রক্ষার শেষ দিকের শক্তি প্রদর্শনের পদক্ষেপ হিসেবে বহু ইতিহাসবিদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
কিন্তু তাদের সেই হিসাব ভেস্তে যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় নেতৃত্ব এবং রাশিয়ার কৌশলগত সমর্থন সেই চাপকে কার্যকর হতে দেয়নি। রাশিয়ার নৌবাহিনীর উপস্থিতি এবং জাতিসংঘে তাদের ভেটো পাকিস্তানপন্থী আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে দুর্বল করে দেয়। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযানে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
এখন প্রশ্ন করি– মুক্তিযুদ্ধে কে অস্ত্র দিয়েছিলো? কে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো? কে নিজের সৈন্যদের জীবন দিয়ে যুদ্ধ করেছিলো? কে এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিলো? কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করেছিলো?
উত্তর একটাই– ভারত ও রাশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলো। আর আমেরিকা দাঁড়িয়েছিলো পাকিস্তানের পক্ষে।
তাই আজ যারা বলে, “আমেরিকা বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু”, তারা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয় সংকটের দিনে। বাংলাদেশের সেই সংকটের দিনে ভারতের সৈন্যরা রক্ত দিয়েছে, আশ্রয় ও অস্ত্র দিয়েছে। রাশিয়া কূটনৈতিক ঢাল হয়েছে, আর আমেরিকা পাকিস্তানকে রক্ষার চেষ্টা করেছে।
ইতিহাসের আদালতে সাক্ষী লুকানো যায় না। মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু ভারত ও রাশিয়া। আর পাকিস্তান ও পাকিস্তানপন্থী রাজাকারদের পরীক্ষিত বন্ধু আমেরিকা। এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন এবং সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য।
