শেখ হাসিনা যা বলেন, তা করে থাকেন – এই পারসেপশন যে শুধু আমাদের আছে, তা নয়। এই পারসেপশন আমাদের বিরোধী পক্ষও বিশ্বাস করে। কিন্তু শেখ হাসিনা যে ডিসেম্বরে দেশে আসবেন, সেটা কীভাবে সম্ভব হবে – তা এই মুহূর্তে বুঝা কঠিন। তারপরেও আমরা কিছু হিসাব করে দেখি।
শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ শিবিরে আছে –
১) আমেরিকা: এরা নিজেদের স্বার্থের কাঙাল। বিদেশে এদের কোনো সুনির্দিষ্ট বন্ধু বা শত্রু নাই।
২) সেনাবাহিনী: এরা খালেদা জিয়ার ভাষায়, ‘অকৃতজ্ঞ কুকুর’। এরাও স্বার্থ পেলে বা উপযুক্ত মুগুর পেলে যে কোনো সময় পল্টি মারবে।
৩) জামায়াত-বিএনপি: এরা আওয়ামী লীগের স্থায়ী শত্রু। কোনো রকম সমীকরণেই এদেরকে বিশ্বাস করা বা এদের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
৪) বাম, সুশীল, টিকটকার, ইউটিউবার, লাল-নাইকা ইত্যাদি: এরা হিটখোর এবং ডলারখোর। এদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নেই (এমনকি এন্টি-আওয়ামী বামরাও ৯০% অরাজনৈতিক)। এদেরকে যে হালকা টাকা-পয়সা দিবে, তার সাথেই বিছানায় যাবে।
৫) হুজুর সম্প্রদায়: এরা ব্রেইনওয়াশড সমাজের আবর্জনা; শক্তের ভক্ত নরমের যম।
৫ই আগস্ট ঘটার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ ছিলো আমেরিকা। আমেরিকা না থাকলে বাকি গ্রুপগুলোকে মোকাবেলা করার মতো সাংগঠনিক শক্তি আওয়ামী লীগের ছিলো। এমনকি ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের নেতারা দলে গুপ্ত পদায়ন করে আওয়ামী লীগারদেরকে ক্রমাগত মাইনাস করার পরেও যা অবশিষ্ট ছিলো, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সেটা নিয়েই বাকিদেরকে মোকাবেলা করতে পারতো। অন্তত সরকার পতন হতো না।
আমেরিকা না থাকলে সেনাবাহিনী খুল্লাম-খুল্লাভাবে সরকার পতনে অংশ নেয়ার সাহস করতো না। বিএনপির দৌঁড় পেট্রোল সন্ত্রাস পর্যন্ত। তারা ১৫ বছরে কখনোই জনগণকে পাশে পায় নি। জামায়াতের “জনপ্রিয়তা” এতোই যে, তারা জুলাই সন্ত্রাসের সময়ে নিজেরা যে জড়িত, তা প্রকাশ করারই সাহস হয় নি। আমেরিকা/ডিপস্টেটই তাদের রেজিম চেঞ্জের বিভিন্ন টুল অনেক বছর ধরে ব্যবহার করে সরকার পতনে সক্ষম হয়েছে।
আমেরিকা কোনো দেশে রেজিম চেঞ্জের আগে সরকারকে অজনপ্রিয় করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও সেটা করা হয়েছে। কিন্তু সরকার পতনের পর বিরোধী পক্ষের মুনাফিকপনা এতোটাই স্পষ্ট হয়েছে যে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট থেকেই জনপ্রিয়তার নিক্তি আওয়ামী লীগের দিকে ঘুরে গেছে। ইউনুসের মতো “বিখ্যাত” অর্থনীতিবিদ দেশের আর্থিক উন্নয়ন করে ফেলবে, বিদেশ থেকে বিনিয়োগ এনে এই করবে, সেই করবে জাতীয় আশা যারা করেছিলো, তাদেরও আশার বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। তারেক জিয়াও মবের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে উদ্ধার করতে ক্ষমতায় বসে নি। তাকে ইউনুসের এক্সটেনশন হিসেবে ক্ষমতায় বসিয়েছে আমেরিকা। ইউনুসের মতো তারও মূল প্রাপ্তি নগদ নারায়ণ। সেও কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়। এই মুহূর্তে দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করছে, শেখ হাসিনাই তাদের সব সমস্যার সমাধান।
এখানে একটা বিষয় খুব ভালোভাবে আমলে নিতে হবে, তা হলো দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। উন্নয়ন না করে লুটপাটের ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষ সকলেই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জামায়াতের কথা বাদ দিলাম। তারা সংখ্যায় ৪-৫%। বিএনপির যে ২৫-৩০% ভোটার আছে, তাদের মধ্যে বড়জোর ১% লুটপাট থেকে লাভবান হচ্ছে। বাকি যারা আওয়ামী লীগের আমলে ভালো চাকুরি করতো, ব্যবসা করতো, তাদের বিরাট অংশও “আগেই ভালো ছিলাম”-এর লোক। তারা এ কথা মুখ ফুটে বলতে পারবে না, ভোটও নৌকায় দিবে না; কিন্তু নিজের স্বার্থ না বুঝার কোনো কারণ নাই। অর্থাৎ দেশের অন্তত ৮০-৯০% মানুষই ইতোমধ্যে মনে মনে হলেও “আগেই ভালো ছিলাম”-এর দলে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে ইউনুস-তারেকের চরম ব্যর্থতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্রটা গুজবের অন্ধকার ভেঙে এখন মানুষের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হচ্ছে। ২৬ লাখ ভারতীয় নেই, ভারতের সাথে কোনো অলাভজনক চুক্তি নেই, মেগাপ্রজেক্টগুলো যে শুধু দুর্নীতি নয়; বরং মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন – এটা মানুষ এখন বুঝতে পারছে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন হবে মূলত এই কারণেই।
কিন্তু শেখ হাসিনার শত্রুরা কি বসে থাকবে? অবশ্যই না। এখন দেখি তাদের কর্মপদ্ধতি কী হতে পারে। আমার মতে সবচেয়ে বড়ো বাধা আমেরিকা। কোনো দেশে রেজিম চেঞ্জের পর যদি আমেরিকার বসানো সরকার অজনপ্রিয় হয়, লোকজন আগের সরকারকে চায়, তাহলে আমেরিকা কয়েকটি কাজ করে –
ক) সেখানে দমন-পীঁড়নের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়, যাতে আগের সরকারের সমর্থকরা একেবারেই চুপ হয়ে যায়।
খ) এরপরও কাজ না হলে তারা একটা গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে দেয়।
গ) গৃহযুদ্ধেও কাজ না হলে একটা পর্যায়ে সেই প্রজেক্ট থেকে পাততাড়ি গুঁটিয়ে নেয়।
ঘ) খুবই রেয়ার কেসে, যখন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে আমেরিকা প্রচণ্ড চিপায় পড়ে, তখন আগের সরকারের সাথে “ডিল”-এ আসে।
এই টেমপ্লেট ফলো করলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে নিজেদের মিনিমাম ক্ষতি করে ম্যাক্সিমাম লাভ। সে অনুযায়ী অভিযোজন ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উপরের (ক) ইতোমধ্যেই প্রয়োগ করা হয়েছে। সেটি ব্যর্থ হয়েছে। দমন-পীঁড়ন করেও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমানো যায় নি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপশন (খ) এর সম্ভাবনা খুব কম। বাংলাদেশে যদিও জামায়াতের হাতে গৃহযুদ্ধ বাধানোর মতো অস্ত্র থাকতে পারে; কিন্তু সেনাবাহিনী গৃহযুদ্ধ চায় না। গৃহযুদ্ধ হলে তাদের ক্ষমতার মনোপলি শেষ হয়ে যাবে। অপশন (গ)-এর সময় এখনো আসে নি। তবে আমেরিকা এই অ্যাপ্রোচ নিলে সেনাবাহিনী নেপথ্যে না থেকে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করবে, আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে যাবে। বেশ কয়েক বছর পরে যখন পাবলিকের আন্দোলনের মুখে টিকতে না পারবে, তখন একটা নির্বাচন দিয়ে সরে পড়তে হবে। আমেরিকা এর আগেই নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে ফেলবে। তখন চলে গেলেও তাদের সমস্যা নেই।
শেখ হাসিনার ঘরে ফেরার সাথে অপশন (ঘ) এর বাস্তবতা জড়িত। গত ২ বছরে আমেরিকা তাদের রেজিম চেঞ্জের ইনভেস্টমেন্টের চেয়ে বহুগুণ লাভ করেছে। ধারণা করা যায়, সেন্টমার্টিনসহ ওই এলাকায় তাদের অবস্থান শক্ত করার জন্যও অনেক কিছু করে ফেলেছে। ইউনুসের মাধ্যমে চরম একপাক্ষিক দাসত্বের যে চুক্তি করেছে, সেটা ১০০% বাস্তবায়ন সম্ভব না, এটা আমেরিকাও জানে। আরেকটা বিষয় হলো, বাংলাদেশে রেজিম চেঞ্জ মূলত বাইডেন পার্টির প্রোজেক্ট, ট্রাম্পের সরাসরি প্রজেক্ট না। যদিও আমেরিকান বৈদেশিক নীতি ক্ষমতার হাতবদলের সাথে কমই পরিবর্তিত হয়, ট্রাম্প কিছুটা আলাদা কেস। ট্রাম্প গড়িমসি করায় ইউনুস তাকে সমগ্র বাংলাদেশ দিয়ে লাইনে এনেছিলো। আওয়ামী লীগ যদি তাদেরকে কিছুটা স্বার্থ ছাড় দিয়ে ডিল করতে পারে, ট্রাম্পও ম্যানেজ হতে পারে। ইউনুসের সাথে যে ডিল করেছে, সেটা টেকসই নয়, আওয়ামী লীগের সাথে করা ডিল টেকসই হবে। ইন্ডিয়ার চাওয়াও এই সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্ব পাবে। অর্থাৎ আমেরিকার সাথে কম্প্রোমাইজে আসার একটা অপশন এখনো আওয়ামী লীগের জন্য খোলা আছে। একটু ব্যাক ক্যালকুলেশন করলে বুঝতে পারবেন, এই অপশনটা মার্কেটে আমেরিকার লোকজনই আগে থ্রো করেছে। আমরা একে “রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ” বলে জানি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সাথে এরকম ডিলে যেতে আমেরিকা আগ্রহী; কিন্তু তারা জানে শেখ হাসিনা ছাড় দিবেন না, তাই তাকে মাইনাস করতে হবে। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ প্রজেক্ট ফেইল মেরেছে। শেখ হাসিনা খুবই বিচক্ষণ পলিটিশিয়ান। তিনি যদি মনে করেন যে, আমেরিকার সাথে কোনো সম্মানজনক ডিলে আসা যায়, যেটা তার বাপের স্বাধীন করা দেশটাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করবে, তিনি সেটা না করার কোনো কারণ নেই।
দৃশ্যপটে আমেরিকার অবস্থান পরিবর্তিত হলে সেনাবাহিনী লাইনে চলে আসবে। তারা বেগম জিয়ার আখ্যায়িত অকৃতজ্ঞ কুকুর। মুগুরের ভয়ে হোক আর হাড্ডির লোভে হোক, আমেরিকাকে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তারেক জিয়া লন্ডনে ফিরতে পারলে বেঁচে যায়। যা ইনকাম হয়েছে, সারাজীবনে আর ক্যাসিনো ভ্রমণ না করলেও পায়ের ওপর পা তুলে কয়েক পুরুষের চলে যাবে। সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর সামর্থ্য বিএনপির এখনো নাই। আর দেশের অর্থনীতির সমীকরণ বিএনপি সমর্থকদেরকেও শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনে অখুশি করবে না। তারেক ভাইয়ার খাল কাটা আর কার্ড বেঁচার ভাওতা তারা বুঝে ফেলেছে। জামায়াত আবার আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে। মতি-মাহফুজরা আবার হাতে পায়ে ধরে টিকে থাকবে। সমন্বয়করা যা কামিয়েছে এর মধ্যেই বিদেশে পাড়ি দিবে। যারা ভিসা পাবে না, তারা গণধোলাইয়ের শিকার হবে। হুজুরশ্রেণি আগের মতোই থাকবে।
শেখ হাসিনার সফল প্রত্যাবর্তনের আগাম নমুনা হলো, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আমলাদের আচরণের পরিবর্তন। পুলিশ দেখা যাবে সমন্বয়ক পিটানো শুরু করেছে। আমলারা বিএনপির মন্ত্রীদের কথায় পাত্তা দেয়া কমাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সমর্থকরা অভিমানী হয়; কিন্তু দল ও দেশের জন্য দরকার হলে সেই অভিমান ভেঙে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১-এ তারা বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ স্বাধীন করেছে। তাঁর কন্যার ডাকে সাড়া দিয়ে ২০২৬-এও আরেকবার দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ করতে আওয়ামী লীগারদের অভাব হবে না। তবে শেখ হাসিনা অবশ্যই চেষ্টা করবেন বিনা রক্তপাতে দেশকে শত্রুর হাত থেকে উদ্ধার করতে। শেখ হাসিনা যা বলেন, তা করেন। এবার কাজটা কোন প্রক্রিয়ায় করেন, তা অদূর ভবিষ্যতেই স্পষ্ট হবে। ( A team)
