বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার এখনও আইনিভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও, ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রয়টার্সকে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৩৪টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বিডি ডাইজেস্ট নিউজ টিমের সংকলন করা তালিকা অনুযায়ী, এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার অন্তত ২৫টি দেশের গণমাধ্যম এই সাক্ষাৎকারের বরাতে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
যে সাক্ষাৎকার ঘিরে এই আলোচনা
১০ই জুলাই রয়টার্সের প্রতিবেদক কৃষ্ণা এন দাসকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, তিনি ও আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন। ফিরলে গ্রেপ্তার এমনকি প্রাণনাশের শঙ্কাও উড়িয়ে দেননি তিনি, তবে বলেছেন নিজ মাটিতেই যেকোনো পরিণতি মেনে নিতে প্রস্তুত।
নির্বাসনে থাকাকালে লিখিত প্রশ্নের জবাব দিলেও সরাসরি সাক্ষাৎকার এর আগে দেননি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী—রয়টার্সের ভাষায়, এটিই তার প্রথম প্রকাশ্য সময়সীমা নির্ধারণ।
সাক্ষাৎকারে তিনি ঢাকার পক্ষ থেকে তাকে ফেরত পাঠাতে বারবার ভারতের কাছে চিঠি পাঠানোর কথাও উল্লেখ করেন এবং জানান, এ বিষয়ে কোনো সরকারের সাথে তিনি পরামর্শ করেননি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—কোনো পক্ষই রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
দেশে নিষেধাজ্ঞা, বিদেশে ব্যাপক প্রচার
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম—সাইবার স্পেসসহ—নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও স্থগিত করে।
এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংশ্লিষ্ট বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকার কথা। ফলে বাংলাদেশের প্রচলিত মূলধারার গণমাধ্যমে হাসিনার বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার সরাসরি প্রচারের সুযোগ কার্যত সীমিত।
তবে বিডি ডাইজেস্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের বাইরে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে।
রয়টার্সের নিজস্ব প্রতিবেদন ছাড়াও যুক্তরাজ্যের বিবিসি বাংলা, ইয়াহু নিউজ; যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট, এওএল; ইতালির ইন্তারনাজিওনালে; পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, জিও নিউজ, পাকিস্তান টুডে, ডেইলি টাইমস; সৌদি আরবের আরব নিউজ; এবং ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়া টুডে, জি নিউজসহ অসংখ্য সংবাদমাধ্যম এই সাক্ষাৎকারের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
তালিকা অনুযায়ী দেশভিত্তিক বিন্যাসে সবচেয়ে বেশি প্রতিবেদন এসেছে ভারত থেকে—৭৮টি সংবাদমাধ্যম, যা মোট তালিকার প্রায় ৫৮ শতাংশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০টি, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান থেকে ৬টি করে, মালয়েশিয়া থেকে ৪টি এবং সিঙ্গাপুর থেকে ৩টি সংবাদমাধ্যম রয়েছে।
এছাড়া ইতালি, শ্রীলঙ্কা, সাইপ্রাস থেকে ২টি করে এবং হংকং, সৌদি আরব, আজারবাইজান, নেপাল, কাতার, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আফগানিস্তান, স্পেন, সোমালিয়া, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক ও বাহরাইনের অন্তত একটি করে সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুটি সংবাদমাধ্যম (বিজনেস টাইমস বিডি ও আগামীর সময়) এই সংকলিত তালিকায় জায়গা পেয়েছে—যা দেশের অভ্যন্তরে থাকা নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতার প্রতিফলন হিসেবে বিশ্লেষকরা দেখছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংবাদটি একটি অন্যতম আলোচিত বৈশ্বিক খবরে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। দেশত্যাগের পর তিনি সরাসরি কোনো সাক্ষাৎকার দেননি, যদিও লিখিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন গণমাধ্যমকে।
জুলাই আন্দোলনে ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযানের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়, জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী যে সহিংসতায় প্রায় ১৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
বাংলাদেশ বারবার ভারতের কাছে তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালেও, এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
