আয়নাল কারিগর
ছাত্রলীগের শহিদ নেতাকর্মীদের স্মরণে: বহদ্দারহাট এইট মার্ডারের ২৫ বছর, জামায়াত-শিবিরের হাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হ*ত্যার নারকীয় অধ্যায়
আজ ১২ই জুলাই। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে বহুল আলোচিত ‘এইট মার্ডার’ এর ২৬ বছর পূর্ণ হলো। এদিন জঙ্গি সংগঠন শিবিরের ব্রাশফায়ারে ছাত্রলীগের ৬ নেতাকর্মী ও ২ গাড়িচালক ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এমন ঘটনায় তোলপাড় হয় সারাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তুমুল ক্ষোভ ঝাড়েন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের ওপর সেই সময়।
মামলায় রায় কার্যকর হওয়ার আগেই রাজনৈতিক পালা বদলে আসামিরা নিরুদ্দেশ হয়ে যায় বিএনপি-জামায়াত সরকারের ইন্ধনে।
২০০০ সালের ১২ই জুলাই চট্টগ্রামের শেরশাহ পলিটেকনিক এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে যাওয়ার জন্য বাকলিয়ার সরকারি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে যাচ্ছিলেন। গাড়ি বহদ্দারহাট পুকুরপাড় এলাকায় এলে আরেকটি মাইক্রোবাস তাদের সামনে গতিরোধ করে। মুহূর্তের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্রাশফায়ার শুরু করে বর্বর শিবির ক্যাডাররা। গাড়ির ভেতরে লুটিয়ে পড়েন ছাত্রলীগের ৬ নেতা, শহিদ হন মাইক্রোবাসের চালক ও এক অটোরিকশা চালকও।
শিবিরের কিলার সাজ্জাদ
শহিদ ছাত্রলীগ নেতারা হলেন- সরকারি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট (পলিটেকনিক এলাকা) ছাত্র সংসদের ভিপি হাসিবুর রহমান হেলাল, এজিএস রফিকুল ইসলাম সোহাগ, ইনস্টেটিউটের ছাত্র জাহাঙ্গীর হোসেন, বায়েজিদ বোস্তামি ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, শেরশাহ কলেজ ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আবুল কাশেম, জাহিদ হোসেন এরশাদ, মাইক্রোবাস চালক মনু মিয়া এবং অটোরিকশা চালক কাশেম।
চট্টগ্রামে বেপরোয়া শিবির-সাজ্জাদের বাহিনী:
এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়। যা ‘এইট মার্ডার’ হিসাবে পরিচিতি পায়। মামলায় আসামি করা হয় ২২ জনকে। বিচার চলাকালে ২ জন মারা যায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে ২০০৮ সালের ২৭শে মার্চ মামলার রায় দেন চট্টগ্রামের দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ একরামুল হক চৌধুরী। রাষ্ট্র পরে ৪৩ সাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত দায়রা জজ ২০০৮ সালে ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রায়ে ৩ জনকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়।
রায়ে জঙ্গি সংগঠন শিবিরের ক্যাডার সাজ্জাদ হোসেন খান (বড় সাজ্জাদ), মো. আলমগীর কবির ওরফে বাইট্টা আলমগীর, মো. আজম ও মো. সোলায়মানকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এছাড়া আরও ৩ শিবির ক্যাডার- হাবিব খান, এনামুল হক ও আবদুল কাইয়ুমকে যাবজ্জীবন ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। যাবজ্জীবন পাওয়া আসামিরা পালিয়ে যায় আগেই।
চট্টগ্রামে অস্ত্র-গুলিসহ শিবিরের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী ইকরাম গ্রেপ্তার
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ৪ আসামি। একইসঙ্গে রায় অনুমোদনের জন্য তা ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে আসে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের এপ্রিলে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে বিচারপতি আব্দুল হাই ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের ডিভিশন বেঞ্চ ফাঁসির ৪ আসামিকে খালাস দেন।
খালাসপ্রাপ্তরা হলো- সাজ্জাদ হোসেন খান ওরফে সাজ্জাদ, আলমগীর কবির ওরফে মানিক, আজম ও মো. সোলায়মান।
রায়ে খুনি রা খালাস পেয়ে যাওয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবী বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সন্তোষ প্রকাশ করে একে আইনের শাসনের বিজয় বলে উল্লেখ করেছেন।
লাশের স্তূপের নীচে পড়ে বেঁচে যাওয়া ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল জানান, পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েও বাঁচার জন্য হাতে মুখে রক্ত মেখে মৃতের ভান করে শুয়ে ছিলেন লাশের নীচে। খুনিরা লাশ উল্টে দেখেছিল। সাইদুল মরে গেছে ভেবে তাকে ফেলে যায় খুনিরা। এ মামলায় সাইদুল আদালতে সাক্ষ্যও দেন।
কোথায় শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ
শহরের বায়েজীদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকার আবদুল গনি কন্ট্রাক্টরের ছেলে শিবিরের কিলার সাজ্জাদের বিরুদ্ধে শুধু বায়েজীদ থানাতেই হত্যাসহ ১০টি মামলা রয়েছে। এইট মার্ডারসহ বিভিন্ন অপরাধে তার বিরুদ্ধে মোট মামলার সংখ্যা ১৩টি। একটি অস্ত্র মামলায় তার ১০ বছরের জেল হয়। তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা বিচারাধীন এবং ৭টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এইট মার্ডার মামলার রায়ের আগে ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পায় সাজ্জাদ। ২০০৫ সালে ভারতে পালিয়ে পরে চলে যায় দুবাই।
২০১২ সালের নভেম্বরে সাজ্জাদ ভারতে গ্রেপ্তার হয় অপর এক ঘটনায়। এর আগে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বাংলাদেশ থেকে ইন্টারপোলকে বার্তা দেয়া হয়েছিল।
দিল্লির তিহার জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবারও নিরুদ্দেশ হয় সাজ্জাদ। ২০০১ সালে একে-৫৬সহ পাঁচলাইশ চালিতাতলী থেকে গ্রেপ্তার হয় সাজ্জাদ। দেড় বছর পর জামিন পেয়ে চট্টগ্র্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের নেতা ও সাংসদ শাজাহান চৌধুরীর সহায়তায় দুবাই পালিয়ে যায় সাজ্জাদ। দুবাইতে ব্যবসা আছে সাজ্জাদের। সেখানে থাকা অবস্থায় ভারতের পাঞ্জাবের এক তরুণীকে বিয়ে করে। তাদের সন্তানও রয়েছে।
দেশ ছাড়ার পর থেকেই সাজ্জাদ ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক পরিচয় ও পাসপোর্ট ব্যবহার করছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে বারবার চেষ্টার পরেও তাকে শনাক্ত করতে পারেনি ভারত সরকার।
