ইমতিয়াজ মাহমুদ
(১)
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমাকে ফিরতেই হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। যদি মৃত্যুই আসে, আমি চাই আমার নিজের মাটিতেই মৃত্যু হোক—যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাঁদের রক্ত ঝরেছিল।’ শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পরিকল্পনা করছেন, কবে ফিরবেন, ফিরে কি করবেন এইরকম সব আলোচনার মধ্যে আমি খুব ইয়ের কিছু দেখি না, তিনি বাংলাদেশেরই একজন রাজনৈতিক নেতা, এখানেই তিনি ফিরতে চাইবেন এটাই তো স্বাভাবিক।
আমার হাসি প্রায় সেইসব মনের মধ্যে ফ্যসিস্ট টাইপ লোকেদের প্রতিক্রিয়া দেখলে। এরা কারা? ঐ যে, মাওবাদী বা সাবেক মাওবাদী, ভাসানিওয়ালা, জমাতি হেফাজতি পাকিস্তানওয়ালা কাবুলিওয়ালা, ওরা। সাথে কিছু রাজাকারের সুপ্ত গুপ্ত বাচ্চাকাচ্চাও আছে, যারা নানারকম শোভন রাজনৈতিক ক্যাম্পে মুখে রঙ মেখে লুকিয়ে আছে। ওদেরকে ফ্যাসিস্ট মনোবৃত্তিওয়ালা বলছি কেন? কেননা ওরা স্বভাবে ফ্যাসিস্ট, কিন্তু শক্তি নাই বলে ফ্যাসিজম কায়েম করতে পারে না। এরা আওয়ামী লীগ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ভারত এই তিনকে শত্রু হিসাবে প্রচার করে আর ওদের কণ্ঠ রুদ্ধ করার কথা বলে, আর পারলে ওদেরকে মেরে ফেলে।
এদের প্রতিক্রিয়া দেখলে হাসি পায়। ফেসবুকে আপনি এইরকম পোস্ট দেখতে পাবেন। কেউ কেউ পণ্ডিতের মতো, কেউ কেউ নাবালক শিশুর মতো, কেউ কেউ মুখে গরম লোহার ছ্যাকা খাওয়া প্রশিক্ষিত সাপের মত বিচিত্র বিশ্লেষণ, চিৎকার চ্যাঁচামেচি, কান্নাকাটি ও ফোঁসফাঁশ শুরু করেছে। না, শেখ হাসিনা কি আসলেই ফিরবেন? ফিরবেনই যদি গেলেন কেন? না, এইগুলি প্রোপাগান্ডা, ভারত হাসিনাকে ফিরতে দিবে না এইরকম নানা কথা। চোখের সামনে পড়লে আপনি পড়ে দেখবেন। ফেসবুকে তো আছেই, ছাপা কাগজেও এইসব লোক নানা ইয়ে ফেঁদেছে। পড়ে দেখবেন, হাসিও আসে, মায়াও লাগে।
(২)
মায়া লাগে ওদের চেহারা এবং উচ্চারিত শব্দের গায়ে লেগে থাকা আতঙ্ক দেখে। এই দুই বছর সময় ধরে ওরা এই রাষ্ট্রের সাথে, রাষ্ট্রের মানুষের সাথে, শেখ হাসিনা এবং ওঁর পার্টি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে যেসব আচরণ করেছে সেগুলি ন্যায় ছিল না- ওদের ভাষায় ইনসাফ ছিল না। ন্যুনতম শোভন আচরণ ওরা করেনি বাংলাদেশের বিপুল মানুষের সাথে। শেখ হাসিনা ফিরবে শুনেই এরা আতঙ্কে হীম হয়ে গেছে। ওদের নিজেদের তো শক্তি নাই দেড় ছটাক, মিলিটারি পুলিস এবং সমাজের নানা অপশক্তির কাঁধে ভর করে ওরা এইসব অসদাচরণ করেছে। এখন যদি শেখ হাসিনা ওদেরকে শায়েস্তা করতে চান!
এমনিতে শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন সেটাতে তো আপনার চিন্তিত হওয়ার কথা নয়। তিনি এই দেশের নাগরিক, দেশে তো ফিরতেই পারেন। আপনাদের মনে থাকার কথা, এর আগেও তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, তিনি ঠিকই ফিরেছেন। এখন তো তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড আছে, কারাদণ্ড আছে, চলমান মামলা আছে এক গুচ্ছ। দেশে ফিরলেই তিনি কারাগারে যাবেন। আপনারা যদি তাঁর বিচার করতে চান, বিচার তো করতেই পারবেন। দণ্ড বাস্তবায়ন করতে চাইলে তাও পারবেন। আপনারা তো খুশী হবার কথা। গোসা হওয়ার তো কিছু নাই। ভারতও হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে, যাক বাবা, ঝামেলা গেছে, এখন আমরা নির্ঝঞ্ঝাট তেল নুন পেঁয়াজ মরিচ কাপড় বিদ্যুৎ সব বেচব।
এইসব রাজনৈতিক আগাছার ভয়টা কি? ভয়টা কি নেহায়েত অমূলক? ওরা ভয় পায় মানুষকে। ওরা জানে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষ শেখ হাসিনাকে ভালোবাসে। ওরা মুক্তিযুদ্ধ জানে, বঙ্গবন্ধু জানে আর নৌকা চেনে। আর এই সবকিছুরই প্রতীক ওদের কাছে শেখ হাসিনা। ওরা জানে বাঙালী পরিচয়ে যেটুকুই অহংকার করবার বিষয় আছে সেটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এসেছে। মানুষ ভরসা করে শেখ হাসিনার উপর, শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ঠিক কাজ ভুল কাজ নানা কিছু করেছেন, কিন্তু মানুষের আস্থার এই জায়গাটা ম্লান হয়নি। আগাছাদের ভয়টা হচ্ছে যে শেখ হাসিনা ফিরলে মানুষের রোষে এরা উড়ে না যায়।
(৩)
আর আমাদের নিওলবারেল প্রতিষ্ঠান ও যে একমুঠ সুশীল আছেন ওরাও ভয় পায়। ওদের ভয়ের কারণ হচ্ছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী ক্যারেক্টার। শেখ হাসিনা আসলেই এরোগেন্ট আছেন। পার্লামেন্টে যে পার্থ পদ্মা সেতুকে এরগেন্সের প্রতীক বলেছেন, সেটা কিন্তু ভুল বলেননি। শেখ হাসিনাও পদ্মা সেতুকে সেইভাবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন- দেশবাসীকে দেখাতে চেয়েছেন যে আমরাও পারি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সেটাও। এগুলির উন্নয়ন মূল্য কি আছে সেটা নিয়ে তর্ক করা যায়, ফাইনান্সিয়াল ইকনোমিকসের হিসাব কিতাব করা যায়। কিন্তু এইসব প্রকল্পের একটা এরোগেন্স ভ্যালু কিন্তু ঠিকই আছে।
একটা জাতির জাতীয়তাবাদী চেতনা যদি একটু তীব্র হয় তাইলে একটা এরোগেন্স তো থাকেই। সেইরকম জাতিকে পশ্চিমানিয়ন্ত্রিত নিওলিবারেল ব্যবস্থা দিয়ে বাঁধা কঠিন। সেইসাথে ঐ যে বিশ্বব্যাংক আইএমেফ এইরকম সব সংস্থার তৈরি গণতন্ত্রবিরোধী যে সুশাসন নামক ভণ্ড মন্ত্রটা, সেটাও বাস্তবায়ন করা যায়না। এইজন্যে দেখবেন যে নিওলিব গুড গভার্নেন্সপন্থী যারা ওরা শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে না। ওরা মিলিটারি পছন্দ করে, আমলা পছন্দ করে, বিদেশী ডিগ্রী পছন্দ করে। এরা গরীব মানুষকে প্রান্তিক জনগণ বলে আর আহা উঁহু করে, কিন্তু গরীব মানুষ নিজেরা দেশ শাসন করবে সেটাকে ঠিক মনে করেনা।
এরা শেখ হাসিনাকে ভয় পায় কারণ শেখ হাসিনা গরীব মানুষের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয়। কারণ শেখ হাসিনা অফিশিয়ালি দলের নীতি হিসাবে বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করেছেন বটে, কিন্তু পশ্চিমাদের মাস্তানি তিনি পছন্দ করেন না। শেখ হাসিনাকে নিয়ে আরেক সমস্যা তিনি ভয় পাননা। এই গোঁয়ার মহিলা স্বাভাবে একদম গেঁয়ো চাষাভুষা নারীদের মতো- ভালো দিক মন্দ দিক দুই দিক মিলিয়েই। আমাদের ভুয়া মধ্যবিত্ত এটা পছন্দ করে না, কিন্তু কোটি কোটি মানুষ আছে যারা এই কারণেই শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে- আপন মনে করে। যে মানুষের জন্যে হাসতে হাসতে প্রাণ দেওয়া যায় সেরকম আপন।
(৪)
এরা ঐটাকেই ভয় পায়। এই গেঁয়োগোঁয়ার দাদীআম্মা যদি বাংলাদেশ চলেই আসেন, তিনি জেলে থাকুন আর ফাঁসিতে ঝুলুন, দেশে একটা প্রবল তোলপাড় অবস্থা হয়ে যেতে পারে। সেটা যে কিরকম হতে পারে, কতোটা ভয়াবহ আমরা জানিনা। আমি কেবল আপনাদের এইটা বলতে পারি শেখ হাসিনার আহ্বানে উৎসর্গ দেওয়ার মত প্রাণের অভাব এই বাংলাদেশে অন্তত এই শতক শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত হবে না। আমি ওদেরকে চিনি, আমি ওদেরকে দেখেছি। গুণে শেষ করতে পারবেন না। ওদের সনাক্ত করা কঠিন কিছু না- কেবল একবার জায়গামত জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে মানুষের চোখে দিকে তাকাবেন।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে অনেকের ভয়ের কারণ ঐটাই। মনে রাখবেন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন বঙ্গবন্ধুর চেয়ে দীর্ঘ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে হয়তো তাঁর হয়তো একদম একনিষ্ঠ সেইসব আওয়ামী লীগ কর্মী সমর্থকদের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে খানিকটা, সেই দূরত্ব কেটে যাবে তিনি যদি এখন দেশে ফিরেন। আপনারা যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরব মুছে ফেলতে চেয়েছেন, আপনাদের ভয় সঙ্গত আছে। ভায় পান, ভয় আপনাদের জন্যে উত্তম। শেখ হাসিনা ফিরে এসে যদি তাঁর কর্মী বাহিনীর সেই অংশটিকে সক্রিয় করতে পারেন, তুলার মতো উড়ে যাবেন।
আমি কিন্তু ঐ সময়টা দেখতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আমার আছে। তখন বাঙালীর একটা ভিন্ন চেহারা ছিল- এটার বর্ণনা করা যায়না। দুখিনী মায়ের চোখে আগুন- এটা ছবি এঁকে দেখানো যায়না। আমার ধারনা রাজাকারদের আস্ফালন বাঙলার মানুষের সেই চেহারা আবার ফিরিয়ে আনবে। আমি আমার মৃত্যুর আগে বাঙালীর সেই চেহারাটা আবার দেখতে চাই।
(৫)
আমার ব্যক্তিগত একটা আকাঙ্ক্ষা আছে। ৭১এর মার্চে আমার মা আর বকুল আপা লাল সবুজের মাঝখানে সোনালী ম্যাপ আঁকা পতাকা হাতে মিছিল করেছিলেন। আমি তখন নিতান্ত শিশু। মিছিলে ওদেরকে দেখতে দেবীমূর্তির চেয়ে সুন্দর লাগতো- কি উজ্জ্বল মায়াময় দুখিনী অথচ সাহসী চোখ! মামনি আর বকুল আপা ওরা এখন আর নেই। আমি নয়া জমানার বাঙালী মায়েদের বোনেদের সেই চেহারা আরেকবার দেখতে চাই। মামনি আর বকুল আপা মিছিল করে যে বাংলাদেশ এনেছিল, সেটা তো লুট হয়ে যায় যায়, আপনারা সেটা রক্ষার নিমিত্তে লড়বেন। সেটা দেখার পর মরে গেলে গেলাম।
