শারমীন আক্তার
·
একজন বৃদ্ধার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ঘটনা কি তা এখনও পুরোপুরি স্পস্টভাবে কোথাও পেলাম না কিন্তু পুরো আসল ঘটনা জানার আগেই ফেসবুকের প্রায় অধিকাংশ মানুষজন এসে তার ছেলেদের অভিশাপ দিচ্ছে, চাকুরী থেকে অব্যাহতির কথা বলতেছে, গালাগালি করতেছে!!! মানে যাচ্ছেতাই অবস্থা!!! আবার কেউ কেউ সরেস এক কাঠি উপরে উঠে ছেলের বউগুলারে গাইলাতেছে!! মানে কি আর কইতাম!!!
কিন্তু কেউই এখন পর্যন্ত পুরা ঘটনা পরিস্কার জানে না বলেই মনে হচ্ছে কারণ কোথাও আমি বিস্তারিত খুঁজে পেলাম না। এদিকে আবু সুফিয়ান নামক একজন সাংবাদিক লিখেছে অনলাইনে অতিরঞ্জিত করে এই ঘটনাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঐ বৃদ্ধা নারীর নাকি “স্কিজোফ্রেনিয়া” নামক মানসিক রোগ ছিল।
আরেকদিকে পড়লাম আর একটা ভিডিওতে দেখলাম তার মধ্য বয়স্কা মেয়ে তার পাশের রুমেই থাকত । যে নারী মারা গেছে তার ঘরের অবস্থা শুধু না পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থাই খুবই নোংরা ও অগোছালো। কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ সেখানে থাকতে পারে এটাই একটা অবাক করা বিষয়।
এখন আমার মনে কিছু প্রশ্ন জাগছে।
প্রথমত, এই জীবিত মধ্য বয়স্কা নারী উনি কি মানসিকভাবে সুস্থ? যদি সুস্থই হন তাহলে পাশের ঘরে তার মা ৭ দিন ধরে মরে পড়ে আছে, সে কি সেটা দেখেন নি? দেখলেও তার ব্যবস্থা নেন নি কি কারনে? ছেলেরা একসাথে থাকে না কিন্তু মেয়ে তো পাশের রুমেই থাকত। সে কি মায়ের ঘরে একবারও উঁকি দিত না যে, সে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে????
দ্বিতীয়ত, ধরে নিলাম তার ছেলেরা, বউয়েরা তাদের খোঁজ খবর নেয় না। কিন্তু পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন কেউই কি খোঁজ নেয় না? ছেলেরা খোঁজ না নিলেও প্রতিবেশীরা তো খোঁজ নেয়ার কথা যেহেতু সে বাড়ির মালিক, অন্তত ভাড়া দিতে এলেও তো হাই হ্যালো হবার কথা। ধরে নিলাম বৃদ্ধা বয়স্ক তাই কারো সাথে দেখা সাক্ষাত হয় না। কোন আত্মীয় স্বজন কেন তাদের বাড়িতে আসে না বা ফোন দিয়ে একটা কথা বলে না???
তৃতীয়ত, তাদের বাসায় কি কোন হেল্পিং হ্যান্ড ছিল? থাকলে তার ইন্টারভিউ নেয়া হচ্ছে না কি কারণে? কোথায় একটা পড়লাম যে একজন নার্স পুলিশে ফোন করেছে সেই নার্সের বক্তব্য কি? নার্স কি কারনে রাখা হয়েছিল?
এসব কিছুই পরিস্কার না।
আমরা রীতা-মিতা ও তার মায়ের কথা জানি। যারা “স্কিজোফ্রেনিয়ায়” আক্রান্ত ছিল। তাদের বাসার ভেতরটাও এমন দম বন্ধ করা ছিল। তারা আশেপাশে কারো সাথে মিশত না। অনেক কস্টে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে।
স্কিজোফ্রেনিয়া একটা গুরুতর মানসিক রোগ। এটা চিকিৎসা না করালে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
এবং মনোবিজ্ঞানী হবার সুবাদে এমন অনেক কেস আমি দেখেছি যেখানে মানসিক রোগে আক্রান্ত বয়স্ক বাবা মা কে ছেলে মেয়েরা জোর করেও মানসিক স্বাস্থ্য সেবকদের কাছে নিয়ে যেতে পারে না। আবার তারা বাসায় মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দানকারীদের নিয়ে যেতে চাইলেও বাবা মা বা আত্মীয় স্বজন বা অন্যান্য ভাই বোন সেইটার অনুমতি দেয় না। কারণ এতে করে সবাই ভাববে তার বাবা মা বা আত্মীয় পাগল হয়ে গেছে, লোক হাসাহাসি করবে, কানাকানি করবে!!!
সেইসব ছেলে মেয়েদের যে কি অসহায়ত্ব থাকে তা বলে বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশে যতদিন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুল ধারনা বা কুসংস্কার বা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বুলিং না কমবে ততদিন এই সমস্যা দূর হবে না।
এখন আসি কেয়ারগিভারদের কথায়।
দেখুন যাদের বাসায় কোন দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক বা মানসিক রোগী আছে এবং তাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ যে ব্যক্তিটি দেখভাল করে ধীরে ধীরে সেই মানুষটিও অসুস্থ হয়ে যেতে থাকে। কারণ ২৪/৭, ৩৬৫ দিন একটা মানুষের সার্বক্ষনিক খেয়াল রাখা, তার সব কাজ করে দেয়া আবার নিজের সব কাজ করা কোন সহজ কাজ না। আবার এক্ষেত্রে শারীরিক রোগীদের চাইতে মানসিক রোগী সামাল দেয়া অনেক চ্যালেঞ্জিং কারণ মানসিক রোগীকে একইসাথে শারীরিক ও মানসিক দুভাবেই সমান সাপোর্ট দিতে হয়। তো যে কেয়ারগিভার থাকে সে যদি নিজের যত্ন আত্তি ঠিক ঠাক না করে তবে তার নিজেরও শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।
বাংলাদেশে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কেয়ারগিভাররা পরবর্তীতে কোন না কোন শারিরীক বা মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যায় কেননা তাদেরকে এটা শেখানো হয় যে নিজেকে শেষ করে হলেও রোগীর সেবা যত্ন করে যেতে হবে নাহলে পাপ হবে। আর সমাজের মানুষজন তো বসেই আছে তাদের সেবা যত্নে একটু অবহেলা হলেই কথা শোনানোর জন্য এবং অভিশাপ দেয়ার জন্য!!
এই বৃদ্ধার মৃত্যু আমাদেরকে আমাদের দেশের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবহেলা ও কুসংস্কারগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
আমি এখানে এই বৃদ্ধার ছেলে মেয়েকে দায়ী করার আগে এই সমাজের নোংরা, কুৎসিত মানসিকতার মানুষগুলোকে দায়ী করতে চাই যাদের জন্য মানুষ “মানসিক স্বাস্থ্যসেবা” নিতে ভয় পায়, লজ্জা পায়, সংকোচ বোধ করে!!! যাদের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নেয়াটাকে মানুষ ভাবে শুধুমাত্র “পাগল” রাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে যায়!!!
এখনও পুরো ঘটনা না জেনে বাংগু সমাজ যেভাবে এই বৃদ্ধার ছেলে মেয়েকে অভিশাপ দিচ্ছে, জাজমেন্ট করছে তাতে করে এদের মানসিকতা কি রকম তার পরিচয় তারা দিচ্ছে!!!
তার ছেলে মেয়েকে জাজ করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুণ তো আপনি কি নিজে মানসিকভাবে সুস্থ আছেন??? আর আপনি যদি জানতেন যে এই ছেলে মেয়ে তার মাকে মানসিক স্বাস্থ্য সেবকের কাছে নিয়ে গেছে এবং তার মায়ের স্কিজোফ্রেনিয়া আছে তাহলে আপনি তাদেরকে নিয়ে কি কি বলতেন?? আপনার মনের মধ্যে কি একবারও এই চিন্তাটা উঁকি দিত না যে ওদের মা পাগল!! পাগলের গুষ্টি!!!
আগে নিজের চিন্তা ভাবনা পালটান তারপর অন্যের দিকে আঙুল তুলুন!! কারণ এটা মনে রাখুন একটা আঙুল যখন আপনি অন্যের দিকে তোলেন বাকী ৪টা আঙুল আপনার দিকেই তাক করা থাকে!!!
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আপনার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি আগে পালটান তাহলে তাহলে এরকম ঘটনা ঘটলে আপনাকে ফেসবুকে এসে ছি ছি করতে হবে না বা কাউকে অভিশাপ দিতে হবে না!!!
