তানজিনা ইসলাম
আমরা জানি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক বিখ্যাত কবি সাহিত্যিক বিজ্ঞানী রয়েছেন যারা মুসলিম পরিবারের সন্তান জন্ম সুত্রে ,কিন্তু তাদের দমিয়ে দিয়েছিল সেই সময় কারন জ্ঞান চর্চার ফলে মানুষ শিক্ষিত হলে ধর্মের ভন্ডামি জেনে যাবে এই ভয়ে ইসলামি স্বর্ণযুগে (৮ম থেকে ১৪শ শতাব্দী) জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিবাদে অসাধারণ অবদানের জন্য অনেক বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম মনীষীকে তৎকালীন ধর্মীয় রক্ষণশীলদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। তাঁদের প্রবর্তিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিন্নতা বা গ্রিক দর্শনের চর্চার কারণে অনেকেই কাফের বা মুরতাদ ফতোয়ার শিকার হন।
এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন মনীষী হলেন:
ইবনে সিনা (Avicenna):
সর্বকালের অন্যতম সেরা চিকিৎসক ও দার্শনিক ইবনে সিনাকে ধর্মীয় রক্ষণশীলরা সরাসরি ‘কাফের’ এবং নাস্তিকদের ইমাম বা ‘ইমামুল মালাহিদাহ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিশেষ করে পরকাল ও সৃষ্টির সূচনা নিয়ে তাঁর দার্শনিক মতবাদ তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়।
আবু বকর আল-রাজি (Rhazes):
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসক ও রসায়নবিদ আল-রাজি প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে যুক্তি ও দর্শনের চর্চা করতেন। তিনি ধর্মের ঐশ্বরিকতার চেয়ে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় তাঁর সমসাময়িক আলেমদের কাছে ধর্মত্যাগী বা কাফের হিসেবে চিহ্নিত হন।
ইবনে রুশদ (Averroes):
আন্দালুসিয়ার (স্পেন) এই বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসক অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের ব্যাখ্যা করার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ বা ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যার কারণে ধর্মীয় আদালতে তাঁর বই পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে কাফের ফতোয়া দিয়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
আল-ফারাবি (Al-Farabi): ‘
দ্বিতীয় শিক্ষক’ (আরিস্ততলের পর) হিসেবে খ্যাত এই দার্শনিক ইসলামি দর্শনে নব্য-প্লেটোনীয় চিন্তাধারা যুক্ত করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় ব্যাখ্যার জন্য তৎকালীন মৌলবাদীরা তাঁকে কাফের হিসেবে অভিযুক্ত করেছিল।
ইবনে আল-হায়সাম (Ibn al-Haytham):
আলোকবিজ্ঞানের (Optics) জনক ইবনে আল-হায়সাম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তিতে চোখের দৃষ্টি সংক্রান্ত মতবাদ দিয়েছিলেন। রক্ষণশীলদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বের অমিল থাকায় তাঁকেও কাফের বা ধর্মদ্রোহী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
জাবির ইবনে হাইয়ান (Jabir ibn Hayyan):
রসায়নের ভিত্তি স্থাপনকারী এই মুসলিম বিজ্ঞানীকে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ‘জাদুকর’ বা ধর্মবিরোধী বলে অপবাদ দিয়েছিল।
ইবনুল হাইসাম:
আলোকবিজ্ঞানের (Optics) জনক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবর্তক এই বিজ্ঞানীকে শিয়া মতবাদের একটি ভিন্ন ধারায় বিশ্বাসের কারণে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল।
সুহরাওয়ার্দি আল-মাকতুল:
আলোকের দর্শন (Philosophy of Illumination)-এর প্রবক্তা এই সুফি সাধককে ধর্মবিরোধী মতবাদ প্রচারের দায়ে তৎকালীন সুলতানের আদেশে আলেপ্পোয় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য:
ইসলামে কাউকে বিনা প্রমাণে কাফের (তাকফির) আখ্যা দেওয়া একটি অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। উপরোক্ত মনীষীদের কাফের উপাধি দেওয়ার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অপর্যাপ্ততাও একটি বড় কারণ।
