আফজাল হোসেন
এই দেশে জন্মগ্রহণের পর শিল্পী হওয়া, সাংস্কৃতিকবোধ নিয়ে বেড়ে উঠতে চাওয়া আসলে বোকামো। নানা নিগ্রহ থাকা সত্ত্বেও যুগে যুগে এই চরম বোকামো আগ্রহ নিয়েই মানুষ করে চলেছে। শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সাধনা করে যে জীবন গড়ে ওঠে তার প্রতি সম্মান দেখাতে পারার মানুষ অবশ্যই আছে কিন্তু অসম্মান করা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের চোখে দেখার মানুষও রয়েছে অগণিত।
সুস্থ রাজনীতি এবং সংষ্কৃতিমুখর জীবনই দেশ, সমাজ, মানুষের মঙ্গল করতে পারে। এক কালে দুয়ের অনুশীলন ও চর্চাতেই এই দেশ অনেক অভাবের মধ্যে থেকেও নুন ভাতের স্বাদে সন্তুষ্ট, আনন্দিত ছিল। কষ্টে থেকেও হাহাকার ছড়ায়নি। মানুষ জীবন ভালোবাসতে ও উদযাপন করতে জানতো।
রাজনীতি একসময়ে একলা চলো নীতিতে সাঁতার কাটতে নেমে পড়ে। স্বভাবে এই পরিবর্তন ডেকে এনেছে সর্বনাশ। একলা চলো নীতির রাজনীতিতে ফলপ্রসূ উপাদান হিসাবে যুক্ত হয়ে গেলো ক্রোধ, হিংসা, বিভেদ সৃষ্টিকারী বুদ্ধি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা। এসবের জন্য দায়ী করা হয় রাজনীতিকে?
কে করবে, কারা করবে? রাজনীতির ভুল ধরলে সে দেশের শত্রু। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা তো ঘৃণা ছড়ায় না, বিভেদ সৃষ্টি করে না। অপ্রয়োজনে কাউকে অপমান অমর্যাদা করে না।
সংস্কৃতিপালন মোটেও অনিষ্টকর হয় না। ক্ষতিকর নয়। কোনকালে অনিষ্ট করেছে, এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়, সাংস্কৃতিক চেতনা মানুষের মূল্যবোধকে দৃঢ় রাখে, মানুষকে দায়িত্ববান, কর্তব্যপরায়ন, ধৈর্যশীল হতে সাহায্য করে।
শিল্পী, সংস্কৃতিবান মানুষই “কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট” লিখেছে, সুর করেছে। কিভাবে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী অমন কবি, বিপ্লবী চেতনা জাগানো মানুষকে বিচার করেছেন, জানা আছে অনেকেরই।
“মা তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা আমি নয়ন জলে ভাসি” পড়লে, শুনলে, অনুভব করতে পারলে দেশকে ভালো রাখার প্রত্যয় জাগে। নিজ খেয়ালে এমন কবিতা লিখে ফেলা হয়েছে, তা নয়। লিখে বোঝানো হয়েছে, দেশকে কত গভীরভাবে ভালোবাসতে হবে।
আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের চরণে চরণে যে আবেগ, আকুতি রয়েছে তা কবি, শিল্পী, সংস্কৃতিবান মানুষের পক্ষেই সৃজন করা সম্ভব।
যে সকল মানুষের মনে আবেগ রয়েছে, যে মানুষেরা সংবেদনশীল তাঁরা সহজেই লেখা কবিতার চরণ, গানের সুর, অভিনয়, আঁকা ছবি বা বাজতে থাকা যন্ত্রসঙ্গীতের সুরে মন ডুবিয়ে পরম আনন্দ
অনুভব করতে পারে। জীবনকে সুন্দর ভাবতে পারে। সকল সুন্দরকে টিকিয়ে রাখা দায়িত্ব বলে বিবেচনা করে।
যেসব মানুষ স্বার্থান্বেষী, শুধু নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে জীবন কাটিয়ে দেয়, তাঁদের ভাবনা সীমাবদ্ধ। তাঁরা নিজস্ব ধ্যান ও ধারণায় গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা মানুষ। এমন মানুষদের মনে একটাই প্রশ্ন ও সংকট, যে চমৎকারে আমি আচ্ছন্ন, সবাই তাতে আচ্ছন্ন নয় কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর তাদের মেলে না। মেলে না কারণ তা জগৎ ও নিয়মকে অস্বীকার করা, অন্ধের প্রশ্ন।
দুনিয়া বহুরকম মানুষের। এখানে অব্যয় জোর খাটানো অন্যায়। নিজেই নিজেকে বিচারক বানিয়ে, নিজের মত মতো মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করা ভয়ঙ্কর অপরাধ। দুনিয়া ধৈর্যশীল মানুষদের জন্য, অসহিষ্ণুতা উৎপাদন করা, অসহিষ্ণু মানুষদের নয়।
দুঃখজনক হচ্ছে একদল মানুষ অকারণে, অযৌক্তিকভাবেই মনে করে, শিল্পীরা “বাড়া ভাতে ছাই দেয়া” মানুষ।
চোখ থাকতেও যে মানুষ অন্ধ, তাঁকে হাতি আর খরগোশের পার্থক্য বোঝানো যাবে না। যায় না।
“যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা” বা “যত দোষ নন্দ ঘোষ”-এর মতো কালে কালে শিল্পী, সৃজনশীল মানুষদের উপর বড় দোষ চাপিয়ে দিয়ে একদল মানুষ ভাবে “কেল্লা ফতেহ, কেল্লা ফতেহ”।
প্রবল ক্ষতিকর রাঘব বোয়ালেরা চিরকাল বেঁচে যায়, টিকে থাকে। এ জাতির “সোনামানিক” হতে চাওয়ারা সামনে দিয়ে একটা খড় কেউ সরাতে চাইলে ছ্যাঁৎ করে ওঠে, রেগে আগুন হয়ে যায়, পিছন থেকে পুরো খড়ের গাদা উধাও হয়ে যাচ্ছে তা টের পায় না।
