আবু মকসুদ
প্রায় দুই বছর পর তাকে আবার দেখা গেল। কোনো জনসমুদ্রের মাঝখানে নয়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে নয়, নিজের দেশের মাটিতেও নয়। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ভিনদেশের আকাশের নিচে। যেন দীর্ঘ নির্বাসনের শেষে ইতিহাসের কোনো পুরোনো পাতা হঠাৎ বাতাসে উল্টে গেছে। সেখানে একটি পরিচিত মুখ। ডক্টর জাফর ইকবাল।
কিছু মানুষ শুধু মানুষ নন। তারা একটি সময়ের বিবেক। তারা উচ্চারণ করেন এমন কিছু বাক্য, যা সেই মুহূর্তে অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হয়, কিন্তু সময় ধীরে ধীরে তাদের কথার ভেতরে সত্যের কঙ্কাল দাঁড় করিয়ে দেয়। ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অভ্যাসই হলো, সে তার সাক্ষীদের অনেক পরে গিয়ে সঠিক প্রমাণ করে।
আজ যখন তাকে নিজের দেশের বাইরে দেখা যায়, তখন প্রশ্নটি কেবল একজন লেখক বা শিক্ষকের দেশত্যাগের নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর। এমন কী ঘটেছে, এমন কী বদলে গেছে, যে একজন মানুষ, যিনি একসময় তরুণদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন, তাকেই নিজের জন্মভূমির বাইরে দাঁড়াতে হয়েছে? একটি দেশের জন্য এর চেয়ে বেদনাদায়ক প্রতীক আর কী হতে পারে?
রাজনীতি ক্ষমতার হিসাব জানে। কিন্তু ইতিহাস মানুষের নীরবতা গোনে। কখন কে কথা বলেছিল, কখন কে চুপ করে ছিল, আর কখন কথা বলার মতো বাতাসও অবশিষ্ট ছিল না, ইতিহাস একদিন তার সব হিসাব লিখে রাখে।
বাংলাদেশ আজ যেন নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও নিজের মুখ চিনতে দ্বিধা করছে। একাত্তরের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, রক্তে লেখা জাতীয় পরিচয়, সবকিছু নিয়েই প্রশ্নের ঘূর্ণি। যে নদী একদিন স্বাধীনতার দিকে বয়ে গিয়েছিল, আজ সেই নদী যেন উজানে ফিরতে চাইছে। সময় কখনো কখনো এমনই নিষ্ঠুর হয়। সে মানুষকে শুধু সামনে নিয়ে যায় না, পেছনেও টেনে নিয়ে যায়।
এমন সময়ে জাতির প্রয়োজন শুধু একজন রাজনীতিকের নয়। প্রয়োজন এমন একজন মানুষের, যিনি মানুষের ভেতরের ভয়কে ভাষা দিতে পারেন, হতাশার ভেতরে যুক্তির প্রদীপ জ্বালাতে পারেন। যিনি রক্তের বদলে বিবেককে, প্রতিহিংসার বদলে ইতিহাসকে, বিভেদের বদলে মানবিকতাকে সামনে আনতে পারেন।
ডক্টর জাফর ইকবালকে তাই অনেকে কেবল একজন লেখক হিসেবে দেখেন না। তারা তার মধ্যে খুঁজে পান একজন শিক্ষককে, যিনি বোর্ডে সমীকরণ লেখার পাশাপাশি একটি প্রজন্মের কল্পনাশক্তিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। সেই শিক্ষক যদি আবার কথা বলেন, তবে তা হয়তো কোনো রাজনৈতিক স্লোগান হবে না। হবে একটি জাতির আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান।
ইতিহাসে এমন সময় বারবার এসেছে, যখন অন্ধকারের সবচেয়ে গভীর মুহূর্তেই মানুষ আলোর দিক খুঁজেছে। তখন কোনো সেনাবাহিনী পথ দেখায়নি, কোনো সিংহাসনও নয়। পথ দেখিয়েছে একজন চিন্তক, একজন কবি, একজন শিক্ষক, একজন বিবেকবান মানুষ।
হয়তো সময় আবার সেই আহ্বানই জানাচ্ছে। ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতা থেকে যেন একজন মানুষ নেমে আসেন। তিনি হাতে অস্ত্র নয়, ধারণ করেন শব্দ; কণ্ঠে ক্রোধ নয়, বহন করেন যুক্তি; চোখে প্রতিশোধ নয়, জাগিয়ে তোলেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কারণ শেষ পর্যন্ত জাতিকে টিকিয়ে রাখে বন্দুক নয়, স্মৃতি। ক্ষমতা নয়, মূল্যবোধ। আর ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় আসে সেইসব মানুষের হাত ধরে, যারা মানুষের ভেতরে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। সেই কারণেই বহু মানুষের দৃষ্টি আজও ডক্টর জাফর ইকবালের মতো বুদ্ধিজীবীদের দিকে, এই প্রত্যাশায় যে তারা আবারও জাতীয় আত্মপরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সাহসী ও মানবিক আলোচনার পথ খুলে দেবেন।
